মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের পাবনার পৈত্রিক বাড়ি সংরক্ষণ ও স্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মাণের নির্দেশ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, কালজয়ী অভিনেত্রী সুচিত্রা সুচিত্রা সেনের স্মৃতি সংরক্ষণ করা আমাদের জাতীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। তার অসামান্য অভিনয় দক্ষতা হলমুখী করেছিল তামাম বাঙালিকে। বাংলা সিনেমাকে জনপ্রিয় করে তুলতে তার অবদান অনস্বীকার্য। রায়ে বলা হয়, সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক বাড়ি থেকে যদি এখন পর্যন্ত ইমাম গাযযালী ইন্সটিটিউটকে উচ্ছেদ করা না হয়ে থাকে তাহলে অনতিবিলম্বে এই প্রতিষ্ঠানটিকে উচ্ছেদ করে সেখানে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালার কাজ শুরু করার নির্দেশ দেয়া হলো। বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চ গত ৪ মে এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই বিচারক হলেন, বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। ৫৯ পৃষ্ঠার এ রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন অপর দুই বিচারপতি।
রায়ে বলা হয়, ইমাম গাযযালী ইন্সটিটিউটের আইনজীবী সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক বাড়ি থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সরিয়ে নেয়ার জন্য দুই মাসের সময় চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। কিন্তু তিন বছর অতিবাহিত হলেও এটিকে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেননি। এ কারণে আপিল বিভাগ মনে করে, এটা আদাতের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। এ ধরনের প্রতারণা কঠোর ভাষায় তিরস্কারযোগ্য।
১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল জন্ম নেয়া সুচিত্রার শৈশব-কৈশোর কাটে পাবনার এই পৈত্রিক বাড়িতে। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী এ নায়িকার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটির অবস্থান পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে। সুচিত্রা পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তেন। সুচিত্রা পরিবারসহ ১৯৫১ সালে ভারতে চলে যাওয়ার পর বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত হয় এবং এখানে কিছুদিন সরকারি লোকজন বসবাস করতেন। এরপর ১৯৮৭ সালে তত্কালীন জেলা প্রশাসক সাইদুর রহমান বাড়িটি বাত্সরিক চুক্তিভিত্তিতে ইমাম গাযযালী ট্রাস্টকে ইজারা দেন। এরপর সেখানে ইমাম গাযযালী ট্র্াস্টের নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯১ সালের ১৮ জুন ইমাম গাযযালী ট্রাস্ট বাড়িটি স্থায়ী বন্দোবস্ত নেয়ার আবেদন করে। ওই বছরের আগস্ট মাসে ভূমি মন্ত্রণালয় তাদের স্থায়ী বন্দোবস্ত না দিয়ে আবারো বাত্সরিক ইজারা দেয়। ইজারার টাকা পরিশোধ না করায় ১৯৯৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ইজারা বাতিল করা হয়। কিন্তু পরে বকেয়া পরিশোধ করে ওই বছরের ১৫ আগস্ট পুনরায় ইজারা নবায়ন করিয়ে নেয়া হয়। ২০০৯ সালে ওই বাড়ির লিজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সরকার বাড়িটি ছেড়ে দেয়ার জন্য ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে একটি নোটিস দেয়। নোটিসে বাড়িটি সুচিত্রা সেনের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করার জন্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ঐ বছরে ইমাম গাযযালী ট্রাস্ট সরকারের দেয়া নোটিসের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। এ রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করে প্রতিষ্ঠানটির ওপর স্থিতিবস্থা জারি করেন। ২০১১ সালের ১৩ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে এই বাড়িটি বেদখলে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) আরেকটি রিট করে হাইকোর্টে। পৃথক দুটি রিটে হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চ দু’রকম আদেশ দেয়ায় আপিল বিভাগ বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের আরেকটি ডিভিশন বেঞ্চে পাঠায়। পরে ওই বেঞ্চ থেকে এ রায় আসে। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে প্রতিষ্ঠানটি। গত মে মাসে আপিল বিভাগ তাদের আবেদন খারিজ করে দেয়।
