সিরাজগঞ্জ জেলার চিকিত্সাসেবার মান উন্নয়নের হাওয়া লেগেছে। কারণ এ জেলাটি বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের। যার কারণে চিকিত্সাসেবা নিয়ে হয়রানি কিছুটা কমেছে। তবে মাঝে মাঝে মন্ত্রী নিজ জেলা সফরে গেলে কর্মস্থলে চিকিত্সকদের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মত। মন্ত্রী ঢাকা ফিরে গেলে তাদের কর্মস্থলে পূর্বের অবস্থা ফিরে আসে। ঐ জেলায় কর্মরত চিকিত্সকদের অনেকেই কর্মস্থলে থাকেন না। হাসপাতালের খাতাপত্রে উপস্থিতি থাকলেও অনেকে দায়িত্ব পালন করেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। সরবরাহকৃত খাবারের মান নিম্নমানের। ওষুধ পাচার হচ্ছে কোন কোন উপজেলায়। নার্স সংকট প্রকট। চাহিদা অনুযায়ী জনবল সীমিত। একটি জেনারেল হাসপাতাল, ২০ শয্যার ১টি ট্রমা সেন্টার, ১০ শয্যার ১টি পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ১টি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং ৩২৮টি ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। সরকারিভাবে এ জেলার চিকিত্সার এত সব ব্যবস্থা থাকার পরও অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলের রোগীরা চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক চিকিত্সক বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মালিক। সারাক্ষণ ঐ সব ক্লিনিকে দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত সময় কাটান তারা। সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ পান না। এ জেলায় ২টি প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ২৪টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। অসংখ্য ডায়াগনোস্টিক সেন্টারও রয়েছে। সিভিল সার্জন অফিস থেকে বলা হয়, জেলার সরকারি হাসপাতাল ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাব সেন্টার পর্যন্ত ডাক্তার নার্সসহ মঞ্জুরিকৃত ২০৮১টি পদের মধ্যে ২৯৫টি পদ দীর্ঘদিন শূন্য।
হাজিরা নিশ্চিতকরণ যন্ত্রে সুপার গ্লু
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি চিকিত্সকদের কর্মস্থলে সময়মত নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিতকরণে ২ বছর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এস আই এস প্রকল্প থেকে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন দেয়া হয়েছে। সকাল নয়টায় কর্মস্থলে হাজির হয়ে এই মেশিনে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিলে ঢাকা ডিজি অফিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে জানা যায় চিকিত্সকরা কর্মস্থলে সময়মতো উপস্থিত হয়েছেন কি না। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, সরকারের এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় অসাধু চিকিত্সকদের ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সুপার গু্ল -দিয়ে এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
বক্ষব্যাধি ক্লিনিক
সিরাজগঞ্জ জেলা সদরে প্রতিষ্ঠিত বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য একমাত্র এ হাসপাতালটিতে ১৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১১ জন কর্মরত রয়েছেন।
খোকশাবাড়ী পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র
১০ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালটি ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা একেবারেই নাজুক। এ হাসপাতালে ২২টি পদের মধ্যে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ৮টি পদই শূন্য রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ নোংরা জরাজীর্ণ পরিবেশে রোগীদের চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও জেলা শহরে বসবাস করায় ডাক্তারগণ নিয়মিত কর্মস্থলে আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কামারখন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :৩১ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ইতিমধ্যে ৫০ শয্যায় রূপান্তরের প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এখানে ১০০টি পদের বিপরীতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ৭টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরিফুল হক জানান, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার ও বৈদ্যুতিক জেনারেটর জরুরি দরকার।
উল্লাপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :জানা গেছে, এই উপজেলায় চিকিত্সকের ৯টি পদ থাকলেও ৪টি পদ শূন্য রয়েছে। ২ জন ডেপুটেশনে রয়েছেন। মাত্র ৩ জন চিকিত্সক দিয়ে এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চলছে। অপরদিকে ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও মাত্র ৪টি কেন্দ্রে চিকিত্সক রয়েছেন। জনবল সংকটের এমন বেহাল দশায় কি করে জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান সম্ভব, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উপজেলার ২০ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ২৬টি পদের মধ্যে ৯টি পদ শূন্য রয়েছে। ২৬টি পদ অস্থায়ীভাবে রাজস্বখাতভুক্ত করা হয়েছে। এ পদগুলো স্থায়ীকরণের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুকুমার জানান, ৬ লক্ষ মানুষের এই উপজেলাটিতে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে জনবল দরকার।
শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :৩১ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় রূপান্তরের কাজ চলছে। ২৩১টি পদের মধ্যে ২৪টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বেলায়েত হোসেন জানান, এই হাসপাতালের কোন নিরাপত্তা নেই। এটি এখন নেশাখোরদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের মধ্য দিয়ে বেআইনীভাবে সড়ক
তৈরি করায় যানবাহনের হর্ন আর কোলাহলে এখানে চিকিত্সার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, এভাবে কোন হাসপাতাল চলতে পারে না। এই হাসপাতালটি এখন পোতাজিয়া এলাকার যানবাহনের গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ এবং বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :যমুনার ভাঙ্গন কবলিত চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। ৩১ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নদী ভাঙ্গনের আশংকায় সম্প্রতি এর মূল ভবনের নিলাম বিজ্ঞপ্তি আহবান করা হয়েছে। তবে জনবল সংকট থাকা সত্বেও চরাঞ্চলের মানুষের চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। এ উপজেলায় ১১৭টি পদের মধ্যে ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. গোপাল চন্দ্র সেন জানান, খুব দ্রুত এই হাসপাতাল ভবন নিলাম হবে। নিলাম হলে কোথায় কিভাবে জনগণকে সেবা দিতে পারবো, এখন এটা নিয়েই বেশী ভাবছি।
তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :চলনবিলাঞ্চলের অন্যতম এ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৫০ শয্যায় রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল এখনও নিয়োগ হয়নি। উপজেলায় ১৭ জন চিকিত্সকের পদ থাকলেও মাত্র ৬ জন চিকিত্সক দিয়ে চলছে এই উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগ। চতুর্থ শ্রেণির কোন কর্মচারী এখানে নেই। এ উপজেলায় ১৩৩টি পদের মধ্যে ৩২টি পদ খালি রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ সোলায়মান জানান, জনবল সংকটের কারণে এ হাসপাতালে চিকিত্সা সেবার কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও আমরা জনগণকে সাধ্যমত চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
বেলকুচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :তাঁত সমৃদ্ধ বেলকুচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় রূপান্তরের কাজ চলছে। এই উপজেলার মহিলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক হাসপাতালে থাকেন। ১৪৫টি পদের মধ্যে ২৭টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ উম্মে আজিজ নাসিমা খন্দকার জানান, এই হাসপাতালে চেয়ার টেবিল ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই। সেই সাথে যানবাহন এবং মানসম্মত আবাসন সমস্যা রয়েছে।
রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :এখানে ১৪৪টি পদের মধ্যে ৩৫টি পদ খালি রয়েছে। ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহেদুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে আমাদের একটু অসুবিধা হচ্ছে।
কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স :এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকেও ৫০ শয্যায় রূপান্তরের কাজ চলছে। এখানে ১৭৪টি পদের মধ্যে ৩০টি পদ খালি রয়েছে। এ উপজেলার অধিকাংশ অঞ্চল যমুনার ভাঙ্গন কবলিত হওয়ায় রোগ ব্যধির প্রাদুর্ভাব বেশি।
মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র :মা ও শিশুদের জন্য জেলা সদরে স্থাপিত মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এখানে রোগী এলে দালালরা এদের প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন রোগীরা।
জানা গেছে, গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ গর্ভপাতের জন্য ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস প্রদানের জন্য জেলায় ৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে ১ জন চিকিত্সককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ১ জন চিকিত্সকের পক্ষে ২৪ ঘণ্টা চিকিত্সা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।
আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার :সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় স্থাপিত আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার পৌরবাসীদের চিকিত্সাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এখানে কম খরচে প্রসূতি মায়েদের সার্জারিসহ নানা চিকিত্সা প্রদান করা হয়।
পৌর মেয়র এ্যাড. মোকাদ্দেস আলী জানান, পৌরবাসীর সেবায় প্রসূতি মা ও শিশুদের স্বল্প খরচে মানসম্মত চিকিত্সা প্রদান করা হচ্ছে। নবাগত সিভিল সার্জন ডাঃ সামসুদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, প্রয়োজনীয় চিকিত্সক ও জনবল সংকটের কারণে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
