সারাদেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে অস্বাভাবিক হারে নারী ভোটার কমেছে। শুধু প্রথম ধাপেই নারী ও পুরুষ ভোটারের ব্যবধান প্রায় দুই লাখ। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়া এই ধাপে ১৮১ উপজেলায় ১৩ লাখ ১ হাজার ৬২০ ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৪৮ ও নারী ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭২ জন।
অথচ দেশে বর্তমানে বিদ্যমান হিসাবে ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটারের মধ্যে নারী ও পুরুষের ব্যবধান মাত্র দুই লাখ ৮৫ হাজার। কমে যাওয়ার এই হার ২০০৮ সালের ছবিসহ ভোটার তালিকা, ২০১০ ও ২০১২ সালের হালনাগাদ এবং জনসংখ্যার হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্বাচন কমিশনও নারী ভোটার কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক বলে মনে করছে। কমিশন সচিবালয়-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তথ্য সংগ্রহকারীদের গাফিলতির কারণেই ভোটার তালিকা থেকে নারী ভোটারদের অনেকেই বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে পুরুষ ভোটারদের অনেকেই দ্বিতীয়বারের মতো ভোটার হয়েছেন। এ কারণে পুরুষ ভোটার বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কেন এবং কি কারণে নারী ভোটার নিবন্ধনের হার কমেছে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নারী ও পুরুষ ভোটারের ব্যবধান এমনটা হওয়ার কথা নয়।
২০১৫ সালের ০১ জানুয়ারি যাদের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হবে তাদেরকে ভোটার করার লক্ষ্য নিয়ে গত ১৫ মে থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু হয়। সারাদেশে বিদ্যমান ভোটারের ৫ শতাংশ বৃদ্ধি ধরে ৪৬ লাখ ভোটার বৃদ্ধির টার্গেট করেছে ইসি। মোট তিন ধাপে ৫১৪টি উপজেলা/থানায় হালনাগাদ কার্যক্রমের মধ্যে প্রথম ধাপে ১৮১টি উপজেলায় ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৬৭২ জন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়েছে। এই ধাপে ১৩ লাখ ১ হাজার ৬২০ জন ভোটারের নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন করা ১৩ লাখ ভোটারের মধ্যে পুরুষের চেয়ে প্রায় দুই লাখ নারী ভোটার কম হওয়ায় তথ্য সংগ্রহকারীদের দুষছেন ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিস্টরা। তারা বলছেন, ভোটারের তথ্য সংগ্রহের সময় ১৮১টি উপজেলায় নিয়োজিত তথ্য সংগ্রহকারীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাননি। এমনকি সংশ্লিষ্ট উপজেলায় ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে তেমন প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়নি।
যেসব উপজেলায় নারী-পুরুষের
ব্যবধান সবচেয়ে বেশি কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৭ হাজার ৪১২জন ভোটার নিবন্ধন করা হয়। এর মধ্যে পুরুষ ৪৬৩৯ এবং নারী ২৭৭৩ জন। কুমিল্লার তিতাসে নিবন্ধিত ৬৫৪৯ জনের মধ্যে পুরুষ ৪১৪৯ এবং নারী ২৪০০ জন। লাকসামে নিবন্ধিত ৬৫৮৯ জনের মধ্যে পুরুষ ৪২৯১ এবং নারী ২২৯৮ জন। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১৩৮৬৪ জনের ভিতরে পুরুষ ৮১৪৮ এবং নারী ৫৭১৬ জন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১০৯৪০ জনের মধ্যে পুরুষ ৭১৯২ এবং নারী ৩৭৪৯ জন। একই অবস্থা চট্টগ্রাম জেলা বোয়ালমারী, মিরসরাই, রাউজান, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার, নাগরপুর, মির্জাপুর, ঢাকার দোহার, ধামরাই, নবাবগঞ্জ, নরসিংদী সদর, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, সদরপুর, ফেনী সদর, সোনাগাজী, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সদর, ভোলার বোরহানউদ্দীন, মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ত্রিশাল, ভালুকা, রাজশাহীর বাঘমারা, লক্ষ্নীপুর সদর, রামগঞ্জ, শরীয়তপুর সদর, ভেদরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, সিলেটের কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার এবং হবিগঞ্জের মাধবপুরে। এর আগে ২০১২ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদে মোট ৬৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৩ জন নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।
এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৩৮ এবং পুরুষ ৪১ লাখ ১১ হাজার ৬৬৫ জন। অর্থাত্ নারীর চেয়ে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১২ লাখ ৯৩ হাজার ২৭ জন বেশি ছিল। বিদ্যমান ভোটার তালিকা অনুযায়ী বর্তমান ভোটার ৯ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৬১ লাখ ১৮ হাজার ২২০ জন এবং নারী ভোটার ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার ৪২১ জন।
এদিকে বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে ভোটার তালিকা হালনাগাদ নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার এমন কম হওয়ার কারণ জানতে চান সিইসি। জবাবে সংশ্লিস্টরা জানান, ভোটার হালনাগাদে পুরুষের চেয়ে নারীদের আগ্রহ অনেক কম। অবিবাহিত যাদের বয়স ১৮ পার হয়েছে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটার হননি। এ ক্ষেত্রে অনেকটা তথ্য সংগ্রহকারীরা দায়ী। বিষয়টি পর্যালোচনার নির্দেশ দেন সিইসি। নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্য ও বাদ পড়াসহ সকলেই যাতে হালনাগাদে ভোটার হতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
