মহাসড়কে মহাযন্ত্রণা

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৩
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন বিশেষ কাজে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা রওয়ানা দিয়েছেন গত বুধবার রাত নয়টায়। একটি পরিবহনের এসি বাসে রওয়ানা দিয়ে তিনি ঢাকার মালিবাগে পৌঁছেছেন পরদিন দুপুর দুইটায়। তিনি জানালেন, চট্টগ্রাম থেকে বাস নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়লেও ফেনী পর্যন্ত আসতে তার সময় লেগেছে ছয় ঘণ্টা। এরপরও তিনি আশায় ছিলেন পরদিন সকালে তার ব্যবসায়িক মিটিং-এ যোগ দিতে পারবেন; কিন্তু যতই তিনি ঢাকার দিকে আসতে থাকেন যানজটে নাকাল হন আরো বেশি। চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা বিশ্বরোড, কুমিল্লা সেনানিবাস এবং চান্দিনার আশপাশে তাকে বহনকারী গাড়ি যানজটে আটকা পড়ে। ফল স্বরূপ পরদিন তিনি আর ব্যবসায়িক বৈঠকে যোগ দিতে পারেননি। এতো গেলো যাত্রীর কথা। পণ্য পরিবহনেও একই অবস্থা। সাত/আট ঘণ্টার রাস্তা পার হতে এখন গড়ে সময় লাগছে ১৪-১৫ ঘণ্টা। খানা-খন্দকে ভরা এ মহাসড়কে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনে বেহাল দশা। খাদে চাকা আটকে থাকাসহ নানা ক্ষতি হচ্ছে মোটার গাড়ির। মহাসড়কে এমন দৃশ্য বেশ কিছুদিন ধরে চললেও বর্ষার কারণে অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না দেখে এখন সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। তারা জানিয়ে দিয়েছেন- তিন দিনের মধ্যে সংস্কার কাজ শুরু করা না হলে মঙ্গলবার থেকে তারা মহাসড়কে সব ধরনের পরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেবেন। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে কিছু খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়; কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে এবারের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। বুলডোজারসহ নানা ধরনের ভারী যানবাহন চলার কারণে অনেক স্থানে রাস্তা দেবে গেছে। কোন কোন স্থানে এমন অবস্থা দেখা গেছে যে, চার লেনের জন্য নতুন রাস্তা তৈরি করা হলেও পুরো অংশের অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে দেখা যায়, চট্টগ্রাম থেকে বড় দারোগার হাট পর্যন্ত অংশে রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ। কোন কোন জায়গায় বর্ষায় পানিও জমছে। ড্রাইভাররা রাস্তার কোন অংশে গর্ত হয়েছে তা বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে এসব জায়গায় প্রতিনিয়ত পণ্য বোঝাই ট্রাকের চাকা আটকে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। সীতাকুণ্ড অংশে মোট রাস্তার পরিমাণ ৪৮ কিলোমিটার। চট্টাগ্রামের সিটি গেট থেকে শুরু হয় যাত্রীদের ভোগান্তি। যানজট না থাকলেও কোন কোন এলাকায় রাস্তার অবস্থা এমন যে, পণ্য বোঝাই ট্টাক এবং যাত্রী বোঝাই বাস ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি চলতে পারে না। বারো আউলিয়া, ফৌজদার হাট, ফকির হাট, ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা, বাড়বকুণ্ড, সীতাকুণ্ড, পন্থিছিলা, বড় দারোগারহাট —এসব এলাকায় যানজট নিত্যদিনের চিত্র। অবশ্য বড় দারোগার হাটের পর থেকে মিরসরাই অংশে রাস্তার অবস্থা কিছুটা ভালো। সীতাকুণ্ড অংশে চার লেন প্রকল্পের কাজ পেয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান তাহের ব্রাদার্স। বেশকিছু অংশে তারা সংস্কারের কাজ করলেও দায়বদ্ধতা না থাকায় সংস্কারের কাজে তারা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছে। এর ফলে কোন সংস্কার কাজই তিন-চারদিনের বেশি টিকছে না। আবার মহাসড়ক চালু রেখে সংস্কার কাজ করাও কষ্টকর। এদিকে, মহাসড়কের দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে কুমিল্লার শেষ অংশ মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত তিনটি অংশে ভাগ করে চার লেন প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে। এই এলাকার বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত পড়েছে। যান চলাচলের উপযোগী রাখার জন্য এখানে সংস্কার কাজ নেই বললেই চলে। এর ফলে পথে পথে গাড়ি বিকল হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করছে। মালিক শ্রমিকদের আল্টিমেটাম আগামী তিনদিনের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংস্কার কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। অন্যথায় আগামী মঙ্গলবার থেকে মহাসড়কে বাস, ট্রাক ও লরিসহ সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন তারা। গতকাল চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায় তারা এ ঘোষণা দেন। পরিবহন নেতারা ঈদের আগের তিনদিন এবং পরের তিনদিনসহ মোট সাতদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাক ও লরি চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। তবে খাদ্যসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি চলাচল করতে পারবে। তারা রমজান মাস ও ঈদকে কেন্দ্র করে মহাসড়কে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা ও তল্লাশির নামে পুলিশি হয়রানি বন্ধ করার দাবি জানান। সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন বলেন, অতি বৃষ্টির কারণে খানা-খন্দ সৃষ্টি হয়ে গাড়ি চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি গাড়ি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগছে। চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত যেতেই ৫/৬ ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে। এ ধরনের বেহাল সড়কে ঈদ মৌসুমে যাত্রী পরিবহন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে যোগাযোগ মন্ত্রী চট্টগ্রামে এসে সড়কের সংস্কার কাজ শুরুর নির্দেশ দিয়ে গেলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। সভায় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আখতার, জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু, বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব আবুল কালাম আজাদ, বন্দর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হকসহ বিভিন্ন পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন নেতা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চার লেন প্রকল্পের অবস্থা ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবার কথা ছিলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প। এর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে চারবার। মোট ১০টি প্যাকেজে এ প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে সাতটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চিনোহাইড্রো। তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শেষ করতে পারেনি তা নয়, চুক্তির অংশ হিসেবে তারা তিনটি ব্রিজ, ৩৩ মিটার আন্ডারপাস, ৩৩টি স্টিল ফুটওভার ব্রিজ, ৬১টি বাস স্টপেজ-এর কাজ শুরুই করতে পারেনি। কোম্পানিটি কুমিল্লা এবং পন্থিছিলা অংশে ১৮ কিলোমিটারের একটু বেশি অংশের কাজ শেষ করেছে। এছাড়া পন্থিছিলা থেকে মিরসরাই পর্যন্ত আরো ২০ কিলোমিটার অংশের কাজও শেষ করেছে তারা। দেশীয় কোম্পানি রেজা কন্সট্রাকশন এবং তাহের ব্রাদার্স তাদের কাজের ৬০ শতাংশ শেষ করেছে। ফেনী থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত অংশে সিনোহাইড্রো কোন কোন জায়গায় পাইলিং-এর কাজও শুরু করতে পারেনি। ২০০৬ সালে মোট দুই হাজার ৩৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর প্রকল্পটির ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় তিন হাজার ১৯০ কোটি টাকা। ২০১০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হাবার কথা থাকলেও সময়সীমা বাড়িয়ে তা ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নেয়া হয়। সম্প্রতি যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।