সালাম মুর্শেদির কলাম

স্বপ্নের হাতছোঁয়া দূরত্বে মেসির দল

আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৪
একটি ফাইনালের জন্য মানুষ কতদিন অপেক্ষা করতে পারে? চার বছর, আট বছর কিংবা তারো বেশী? কত দিন প্রিয় দলের সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করা যায়? বিশ বছর। হ্যা, বছরের পর বছর ধরে আর্জেন্টিনা দলকে অন্ধভাবে সমর্থন যুগিয়ে আসা দুনিয়ার কোটি কোটি ফুটবল প্রেমী অবশেষে আনন্দের একটি উপলক্ষ পেলেন। টাইব্রেকারের ভাগ্যপরীক্ষায় নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তাদের সুদীর্ঘ দুই যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটালো আর্জেন্টিনা। পাশাপাশি দিয়েগো ম্যারাডোনার ছায়া থেকে বেরোনোর সুযোগ চলে আসলো লিওনেল মেসির সামনে। আগামী রবিবারের ফাইনালটা মেসির জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসে নাম লেখানোর সুযোগ হিসাবে। ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে যদি তার দল জার্মানিকে হারাতে পারে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসাবে চিরস্থায়ী আসন পাবেন মেসি। যদি অন্য কিছু ঘটে, সেক্ষেত্রে দলের পাশাপাশি মেসির অপেক্ষাটাও দীর্ঘতর হবে। গত বুধবারের রাতের খেলা দেখে পরিষ্কার বোঝা গেছে, ব্রাজিল-জার্মানি সেমিফাইনাল থেকে শিক্ষা নিয়েছে দুই দলই। ব্রাজিলের অতিরিক্ত আক্রমষাত্মক কৌশল বেছে নেয়ার ফলাফলটা দেখা গেছে হাতেনাতেই। জার্মানদের কাছে স্বাগতিক দর্শকদের সামনে সাত গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছে তাদের। সে রকম কোন কিছু যাতে না হয় সেজন্য দুই দলই খেলা শুরু করে সতর্ক ভঙ্গিতে। আক্রমণ কিংবা পাল্টা আক্রমণের চাইতে মাঝমাঠ দখলে রেখে পজেশনাল ফুটবল খেলার দিকে মনোযোগী ছিল তারা। একদল যখন মাঝমাঠ দখল করে ছিল, তখন অন্য দল নিজেদের সীমানা জমাটভাবে বেঁধে রেখেছে। এই কাজে দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে দুই দলই। ডি ভস্নার, ডি ব্রিজ, নাইজেল ডি ইয়ংরা যে রক্ষণের কাজটা ভালভাবেই সামলাতে পারেন সেটা পরীক্ষিতই ছিল। তবে, আরিয়ান রোবেন-ওয়েসলি স্নাইডারদের সামনে আর্জেন্টিনা রক্ষণ কেমন করবে প্রশ্ন ছিল সেটা নিয়ে। বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে ডাচরা যেমন আক্রমণাত্মক খেলেছে, তাতে এরকম শঙ্কা মোটেই অমূলক ছিল না। অথচ মাঠে নেমে দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত। রোবেন-ফন পার্সিদের খেলা দেখে মনে হলো না তাদের গোল করার বড় কোন তাড়না আছে। এতে আসলে তাদের দোষারোপ করার কিছু নেই। কারণ, কোচ লুইস ফন গলের কৌশলটা ছিল আক্রমণের ধার কমলেও গোল হজম না করে থাকা। সেখানে বেশ সফলই ছিলেন তিনি। তবে, তাতে মার্কাস রোজো, বিগলিয়া, বাসান্তাদের কৃতিত্ব কমছে না। পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা ফর্মে ছিলেন তিনজনই। আর হোল্ডিং মিডফিল্ডে জ্যাভিয়ের ম্যাশেরানোর খেলা ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য। দলের প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের ডি বক্স থেকে, নিজেদের গোলবার পর্যন্ত প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা চষে বেড়িয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে রাফ ট্যাকল করতেও দ্বিধা করেননি। আক্রমণ রক্ষণে ভারসাম্য এনে দেয়ার কাজটি অসাধারণভাবে পালন করেছেন এই বার্সেলোনা তারকা। রাইট উইংয়ে বরাবরের মতোই পাবলো জাবালেতা ছিলেন কার্যকর। অন্যপ্রান্তে ইজাকুয়েল লাভেজ্জিও দারুণ ছন্দে ছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালের মতো না হলেও, গঞ্জালো হিগুইনও ছিলেন কার্যকর। যদিও দলের পক্ষে ম্যাচের সহজতম সুযোগটা হাতছাড়া করেন তিনিই। কোন একজন খেলোয়াড় যদি নিষ্প্রভ থাকেন, সেটা মেসি। বলা ভাল, ডি ভস্নারই প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটিকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন। পুরো ম্যাচে মেসির কাছে তেমন বলই আসতে দেননি এই দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডার। টাইব্রেকারে ডি বস্নারের শট মিস করাটাকে আমি বলবো নিয়তির বিরূপ আচরণ। ১২০ মিনিট অসাধারণ খেলার পর খলনায়কে পরিণত হওয়াটা আসলে ভাগ্যের নিষ্ঠুর আচরণ ছাড়া কিছুই নয়। মেসির মতো নিষ্প্রভ ছিলেন, ডাচদের সেরা তারকা রোবেনও। চিন্তা করা যায়, ম্যাচের প্রথমার্ধে মাত্র একটি পাস দিয়েছেন তিনি! আসলে দুই দলের অতিরিক্ত সতর্ক খেলার কারণেই বড় কোন সুযোগ পাননি আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা। এর মধ্যেও রোবেন একটি সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে, আমার দৃষ্টিতে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ম্যাশেরানোর আরেকটি অসাধারণ ট্যাকলে সেটি গোলে পরিণত হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের বীরত্বে শেষ পর্যন্ত নায়ক বনে যান গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। আর্জেন্টিনা যদি এই ফর্মটা ধরে রাখতে পারে, ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে সমান সুযোগ থাকছে তাদের। তবে জার্মানিও থাকবে তুমুল আত্মবিশ্বাসী। টানা চারবার সেমিফাইনালে খেলা দলটি এবার শিরোপার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এটা তাদের জয় স্পৃহা আরো বাড়িয়ে দেবে। তবে যদি অনুপ্রেরণা বা উজ্জীবনী শক্তিই ফাইনালে পার্থক্য গড়ে দেয়, তাহলে আর্জেন্টিনাই থাকবে এগিয়ে। কারণ, সুদীর্ঘ দুই যুগ ফাইনাল খেলতে পারছে না তারা। অথচ, প্রায় প্রতিবারই শিরোপা জেতার মতো দল নিয়েই বিশ্বকাপ খেলতে আসে তারা! শেষ পর্যন্ত যদি আর্জেন্টিনা তাদের তৃতীয় শিরোপা জিতে যায়, তাহলে দেশটির তো বটেই ফুটবল ইতিহাসেই চিরস্থায়ী আসন লাভ করবেন মেসি। পেলে, ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদানের পর বিশ্ব পাবে আরেক চ্যাম্পিয়ন তারকাকে।