সন্তানের আচরণগত সমস্যা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৪, ২০:১৩
দশ বছর বয়সী সন্তানের অসংখ্য-অগনিত আচরণ সমস্যা নিয়ে এক মা-বাবা দিশেহারা হয়ে ছুটে আসেন আমার চেম্বারে। সে বাড়ির কাউকেই মানে না, কারও কথা শুনে না, সবাইকে খুব মারে, খেতে চায় না, কোন কাজ করতে বললে সে কিছুই করতে পারেনা। করার চেষ্টাও করে না, খুব বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আমি পারি না, করবো না, তুমি করো।’ ছেলেটিকে নিয়ে মা-বাবা ভীষণ উদ্বিগ্ন ও হতাশ হয়ে আমাকে বললেন, এর আগে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ও যদি শুধুমাত্র পড়ালেখা করে তাহলে ওর সমস্ত যন্ত্রণা আমরা আজীবন সহ্য করে নিব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ছেলে-মেয়েরা যদি ঠিকমত খায় আর লেখাপড়ায় মনোযোগী থাকে, তাহলে কিছু মা-বাবা সন্তানের আচরণ সমস্যাকে কোন সমস্যা বলেই মনে করেন না বরং তার সমস্ত যন্ত্রণাকে তারা অবলীলায় মেনে নিতে প্রস্তুত থাকেন। আচরণগত সমস্যার লক্ষণ যে কোন বিষয়ে মনোযোগের অভাব। পড়া মনে রাখতে পারে না, লিখতে চায় না, রেজাল্ট খারাপ করছে। অনেকে আবার লেখাপড়ায় খুব ভাল কিন্তু লাজুক, সামাজিকতা বোঝে না, খেলাধুলা করতে পারে না, সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে না। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কোন কাজ একা করতে চায়না, সব কাজ করে দিতে হয়। খেতে চায় না, জোর করে খাওয়াতে হয় অথবা অতিরিক্ত খায়, বারবার বমি করে। ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত কান্নাকাটি করে। কথা বলায় সমস্যা, তোতলামো, কথা গুছিয়ে বলতে পারে না। হিংসুক প্রকৃতির, সারাক্ষণ স্বপ্ন দেখতে বা কল্পনা করতে, অবাস্তব বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পছন্দ করে। আচরণ ও আবেগের দিক দিয়ে অপরিপক্ক, বয়সানুপাতে বুদ্ধি মেধা ও মানসিক বিকাশ যথাযথ নয়। মা-বাবার অনুভূতি আধুনিক মা-বাবা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নিযে বেশ সচেতন, তার মানসিক বিকাশ ও মনের সমস্যা নিয়েও তারা ভাবছেন। সন্তানের মানসিক সমস্যাকে কৈশবেই গুরুত্ব দিয়ে, তা সমাধানের চিন্তা করা প্রয়োজন। যত দ্রুত মা-বাবা নিজে হতাশামুক্ত হতে পারবেন, মানসিক সমস্যাগ্রস্ত সন্তানের স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ততই বৃদ্ধি পাবে। তাই কোন সমস্যা লুকিয়ে না রেখে তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা, অত্যন্ত দুষ্টু হওয়া, অতিরিক্ত শান্ত স্বভাব, আচরণ ও আবেগের দিক থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হওয়া মানেই এই নয় যে, তার বুদ্ধি কম, সে ভাল না বা সে অস্বাভাবিক। এমতাবস্থায় তাকে মারধোর করলে বা জোর খাটালেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এ ধারণা ঠিক নয়। তাদের আচরণে বিরক্ত অতিষ্ট হয়ে মাঝে মাঝে মা-বাবা শাসন করেন আবার আদরও করেন তবুও তেমন কোন কাজ হয় না। বয়স বাড়তে থাকে তার সমস্যাও বাড়তে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে সে দিনে দিনে বড় হয় কিন্তু অন্যদের মত বয়সানুপাতে স্বাভাবিক আচরণ করতে পারেনা। অনেক সময় ছেলে-মেয়েরা স্কুলে-বাড়িতে নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি করে। এ নিয়ে মা-বাবা ও শিক্ষকদের খুব টেনশনের মধ্যে থাকতে হয়। মনোবৈজ্ঞানিক চিকিত্সা পদ্ধতি মা-বাবা একটু সতর্ক ও সচেতন হলে এসব সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছোটখাট মানসিক সমস্যায় অসচেতনতা থেকে ভুল চিকিত্সা অথবা বিনা চিকিত্সার কারণে সাধারণ মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি কঠিন ও জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যা তাকে দীর্ঘ জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। অথচ শিশু কিশোর ও প্রাপ্ত বয়স্কদের আচরণ ও মানসিক সব ধরণের সমস্যাই ওষুধবিহীন মনোবৈজ্ঞানিক চিকিত্সার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব হতে পারে। এ সাধারণ তথ্যটি আমরা অনেকেই জানিনা। যে কোন গুরুতর ব্যাধির মতই আচরণ সমস্যা ও মানসিক রোগের প্রথম অবস্থায় চিকিত্সা শুরু করা হলে, তা আর গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে না এবং সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। তাই কারো আচরণে কোনরূপ সমস্যা বা অসংগতি দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যত কম বয়সে মনোবৈজ্ঞানিক চিকিত্সা শুরু করা যাবে, রোগীর জন্য ততো বেশী সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। চিকিত্সার মাধ্যমে রোগীর সাথে পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কের উন্নতি হলে, পরিবারে শান্তি ও স্বস্থি ফিরে আসবে। মনোবিজ্ঞানী উম্মে কুলসুম কলি গবেষক, কনসালটেন্ট সাইকোথেরাপিস্ট সাইকোলজি রিসার্চ সেন্টার ৫৫/২ পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা