মাতৃমৃত্যুরোধে এখনও অনেক পথ বাকি

আপডেট : ২৯ মে ২০১৯, ২১:৫৭

কোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান এবং আর্থ-সামাজিক চিত্র কতখানি উন্নত, তাহা বোঝা যায় ওই দেশে মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হারের দিকে তাকাইলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চিত্রের গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হইলেও এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হইবে। একটি পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতার কারণে প্রতি বত্সর পৃথিবীতে প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার নারীর মৃত্যু হয় এবং ২৬ লক্ষ মৃতজন্মসহ ৩০ লক্ষ নবজাতক অকাল মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশে প্রতি বত্সর ৫ হাজার ৪৭৫ জন মা এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি, গর্ভকালীন জটিলতা, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা ও পরিবারের অবহেলা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

মাতৃমৃত্যুর এই কারণসমূহ পুরোপুরিভাবে প্রতিরোধযোগ্য। উন্নতবিশ্ব তাহা প্রতিরোধ করিয়া দেখাইয়াছে। সুতরাং আমাদের সমস্যাগুলিও সক্ষমতা অনুযায়ী সমাধানে গুরুত্বারোপ করিলে এই চিত্র ২০৩০ সালের আগেই অনেক বেশি উন্নত হইবে। তবে রবিবার ‘বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ উপলক্ষে অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের বাসাবাড়িতেই বেশির ভাগ গর্ভজনিত মৃত্যু হইয়া থাকে। এই হার প্রায় ৫৪ শতাংশ! ইহার অর্থ এই যে, বিপুল সংখ্যক গর্ভবতী মাকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্সার ব্যবস্থা করা সম্ভবপর হইতেছে না। দেশে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ ইউনিয়নে স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আছে। দেশের ৭৫০টি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া আর কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নাই। সুতরাং এইসকল জায়গার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলিকে সরকার আরো বেশি সেবামূলক করিয়া গড়িয়া তুলিতে পারে। ইহা সত্য যে, কমিউনিটি ক্লিনিককে নূতন করিয়া জাগাইয়া তোলার কৃতিত্ব এই সরকারেরই। ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো তৈরি করা কম ব্যাপার নহে। এখন সেই অবকাঠামোকে মাতৃমৃত্যুরোধের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গড়িয়া তোলা যাইতে পারে। মনে রাখিতে হইবে যে, প্রসব পরবর্তী সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সকল ধরনের মাতৃমৃত্যুর ৫৫ শতাংশই ঘটে শিশু প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এই ব্যাপারে প্রাক-গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন যত্নের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। দেশে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম দুইটি প্রধান কারণের মধ্যে রক্তক্ষরণে ৩১ শতাংশ এবং একলামশিয়ায় (খিঁচুনি) ২৪ শতাংশ। এই দুইটি সমস্যা খুব স্বল্পমূল্যের ঔষধ দিয়া প্রতিহত করা সম্ভব বলিয়া মনে করেন স্ত্রীরোগ ও ধাত্রী বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এইসকল ঔষধ অনেকক্ষেত্রেই সহজলভ্য হয় না। এইক্ষেত্রেও সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করিতে হইবে।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, পরিকল্পনা করিয়া আগাইতে পারিলে ভবিষ্যতে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সুদূর পরাহত কোনো বিষয় হইবে না। একটি গবেষণায় দেখা গিয়াছে, অর্থের অভাব না থাকিলেও সচেতনতার অভাবে ধনী পরিবারের সকল মা এখনও প্রসবের সময় হাসপাতালে আসেন না। আর দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে সমস্যা দুইটি। ইহার একটি হইল সচেতনতার অভাব, অন্যটি অর্থের। সুতরাং নারীশিক্ষা ও দারিদ্র্য নির্মূলের মাধ্যমেও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করা সম্ভব।