চিকিত্সকদের পরিবর্তে প্রশিক্ষণে কর্মকর্তা-কর্মচারী

আপডেট : ২৯ মে ২০১৯, ২১:৫৭

সরকারি কাজের ক্ষেত্রে প্রায়শ যে স্থলে যাহার থাকিবার কথা তাহার পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করা হইয়া থাকে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ইহা অনিয়মের মধ্য দিয়াই করা হয়। ফলে সরকারি কাজের ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা হ্রাস পাইয়া থাকে। আমাদের দেশে এইরূপ অনিয়ম নানা ক্ষেত্রে অনেক দিন যাবত্ ঘটিতেছে। সম্প্রতি এমনই এক অনিয়ম ঘটিয়াছে চিকিত্সকদের বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করাকে কেন্দ্র করিয়া। সেইখানে চিকিত্সকদের পরিবর্তে পাঠানো হইতেছে কর্মকর্তা কর্মচারীদের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ হইতে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ২০ জনকে মনোনীত করিয়া ৫ মার্চ একটি সরকারি আদেশ জারি করা হইয়াছে। মালয়েশিয়ায় সাত দিনব্যাপী একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করিতে চিকিত্সকদের এই প্রশিক্ষণ গ্রহণের কথা; কিন্তু মনোনীত ২০ জনের মধ্যে চিকিত্সক আছেন মাত্র ৭ জন। বাকিরা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারী। একই দিনে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য আরও ১০টি সরকারি আদেশ জারি করা হইয়াছে।  সেইখানে মোট ২১৮ জনের প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে চিকিত্সক আছেন ৯১ জন; বাকিরা হইলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব মিলিয়া ৩২ জন। যে প্রশিক্ষণ চিকিত্সকদের জন্য তাহা কর্মকর্তা বা সচিবেরা গ্রহণ করিয়া কী করিবেন তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় মোট ৯৫ জন যাইতেছেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, স্টেনো টাইপিস্ট, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরিসংখ্যানবিদ। একজন স্টেনো টাইপিস্ট বা পরিসংখ্যানবিদকে এই প্রশিক্ষণ প্রদান যে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় তাহা আমরা কবে বুঝিব! সরকারি অর্থের এই অপচয় গ্রহণযোগ্য নহে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে চিকিত্সকদের পরিবর্তে কর্মকর্তা কর্মচারীদের এই সুযোগ করিয়া দিতেছে বলিয়া অভিযোগ আছে। যেই সকল চিকিত্সককে পাঠানো হইতেছে, তাহাদের ক্ষেত্রেও রহিয়াছে আরেক ধরনের অনিয়ম। যেইসব চিকিত্সককে প্রশিক্ষণে পাঠানো হইতেছে, তাহাদের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাহা উপযুক্ত নহে। যেমন, কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট এন্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রশিক্ষণের জন্য গাইনি ও শিশু বিষয়ের চিকিত্সকরা যাইতে পারিতেন; কিন্তু তাহাদের পরিবর্তে যাইতেছেন সিভিল সার্জন, আরএমও ও মেডিক্যাল অফিসাররা।

খোঁজ নিয়া জানা গিয়াছে, সাধারণত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন শাখার পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টরের সভায় বিদেশ প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের তালিকা প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে সেই তালিকা অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেইখানে সচিবের নেতৃত্বে কমিটি যাচাই-বাছাইয়ের পর তালিকা চূড়ান্ত হইয়া থাকে। ফলে এই প্রক্রিয়ার সহিত মন্ত্রণালয়ের সরাসরি যোগসূত্রতা রহিয়াছে। সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হউক, মন্ত্রণালয়ের সচিব চাহিলে এই দুষ্টচক্র ভাঙিয়া দিতে পারেন এবং যাহা নিয়ম তাহার প্রবর্তন ঘটাইতে পারেন। আমাদের দেশের চিকিত্সা খাত নানা দিক দিয়া পিছাইয়া পড়িয়াছে। দক্ষ চিকিত্সকের অভাব যেমন রহিয়াছে তেমনি রহিয়াছে তাদের প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা। আমরা আশা করিব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়া এই অনিয়ম রুখিয়া দিবে এবং আমাদের চিকিত্সা খাতকে উত্তরোত্তর সামনের দিকে আগাইয়া লইবে।