জনসংখ্যা কি বোঝা? নাকি সম্পদ? জনসংখ্যা হলো শক্তি। শক্তি কখনো বোঝা হতে পারে না। বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ। আর জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,১২৬ জন। যা বলে দিচ্ছে ঘন বসতিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম। তাই জনসংখ্যাকে উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় মনে করা হয়। কিন্তু এ জনসংখ্যার রয়েছে অপার সম্ভাবনা। যার প্রমাণ ইতিমধ্যে বাংলার মানুষ পেয়েছে । জনবহুল দেশের সস্তা শ্রমের দরুন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানিতে একক দেশ হিসাবে প্রথম।
আমাদের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ রয়েছে প্রবাসে। ভাগ্যের উন্নয়নে পাড়ি জমিয়েছে সব পিছুটান ফেলে। যারা মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অবদান রাখছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। যা এখন বিশ বিলিয়ন ছাড়িয়ে। গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও তাদের পাঠানো টাকা বিশেষ ভূমিকা রাখে। যদিও তাদের নব্বই ভাগই অদক্ষ। কিন্তু নারী শ্রমিক ও দক্ষ শ্রমিকসহ বাংলাদেশি শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব, শ্রমশক্তি রফতানিতে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দরুন একদিকে যেমন বাংলাদেশ হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠিত শ্রমবাজার তেমনি পারছে না সৃষ্টি করতে নতুন বাজারও।
কৃষি বাংলাদেশের প্রাণশক্তি। যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় আশি শতাংশ মানুষের। জাতীয় উত্পাদনেও (জিডিপি) এ খাতের অবদান অনন্য। কিন্তু দিন দিন কৃষিতে প্রবৃদ্ধির ক্রমহ্রাসমানতায় নিরুত্সাহিত হচ্ছেন কৃষকরা। ফলে খাতটি আকর্ষণ করতে পারছে না দেশের যুব সমাজকেও। যথোপযুক্ত নীতিগত পদক্ষেপের অভাব, কৃষিজমির ক্রমাগত হ্রাস, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, বাজেটে বরাদ্দ কম এবং কৃষিখাতে যথাযথ গবেষণা ও প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ততা এ খাতের মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। হিমাগারের অভাবও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন করছে কৃষকদের। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অভাবে পচে যাচ্ছে উত্পাদিত পণ্য। ফলে কৃষিপণ্য রফতানিতেও ব্যত্যয় ঘটছে। অথচ কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও সুলভ মূল্যে সার-বীজের নিশ্চয়তা দিলে দেশের ৪০ শতাংশ(আইএলও) বেকারের বড় অংশ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
শুধু কি বিপুল জনসংখ্যাই কর্মসংস্থানের অভাব সৃষ্টি করেছে? নাকি বিশাল জনসংখ্যা থেকেও কাজের লোকের অভাবই মূল কারণ? দ্বিতীয়টিই সত্যি। জনসংখ্যা থাকলেও জনশক্তি নেই আমাদের দেশে। কাজের সুযোগ থাকলেও দক্ষ লোকের অভাব। তাই সম্ভাবনাময় খাত প্লাস্টিকশিল্প, চামড়াশিল্প, কারুশিল্প ও পর্যটনশিল্পে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হচ্ছে না।
বর্তমানে সবচেয়ে বিকাশমান শিল্প হচ্ছে সফটওয়্যার উন্নয়ন। দেশের ৮০০ থেকে ৯০০ কোম্পানি নিজস্ব উদ্যোগে সফটওয়্যার তৈরি করে রফতানি করছে। এ খাতে আগামী পাঁচবছরে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলার। সফটওয়্যারখাতেও রয়েছে দক্ষ জনবলের ব্যাপক চাহিদা। পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও সুযোগ-সুবিধা পেলে সফটওয়্যার রফতানিও তৈরি পোশাকের মতো বেকারত্ব দূর করে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার বোনাসের সময় অতিবাহিত করছে। যা চলবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ১৫ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সের মানুষই বেশি। যারা কর্মক্ষম। আর নির্ভরশীল জনসংখ্যা একেবারে নগণ্য। এ সুযোগ একটি জাতি একবারই পায়। তাই এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে, দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, জনশক্তি রফতানির প্রক্রিয়া সহজিকরণসহ সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অংশ গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। যার জন্য দরকার সঠিক কর্ম পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন।
তাই বলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে দিলে হবে না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে ১.২% (ইউএনএফপিএ-২০১৩) হলেও, আগে যেসব কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতো এখনও সে একই কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা
