বিদ্যুত্ শক্তি যেন জীবনী শক্তির মতোই; জাতির শিরা-ধমনীতে প্রবল ও সক্রিয় উপস্থিতিই তার স্বাভাবিক চলমানতাকে অক্ষুণ্ন রাখে, গতিময় করে। শিল্প-কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, স্বচ্ছন্দ ও শান্তিময় জীবন যাপন, বিনোদন সর্বক্ষেত্রেই বিদ্যুতের উপস্থিতি।
জীবন যেমন থেমে থাকে না, থেমে থাকে না উন্নয়নের উদ্যোগ-আয়োজন; সে কারণে বিদ্যুত্ ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে সব সময়। তেমনিভাবে বিকল্প শক্তির অনুসন্ধানও করতে হয়েছে আমাদের। গ্যাস ও তেলশক্তির সাহায্যে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের দ্রুত জোগান নিশ্চিত করা সহজসাধ্য নয় বলেই বিকল্প বিদ্যুত্ শক্তির প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতা বেশি করে সামনে এসেছে। এই প্রয়োজন মেটাতেই সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছে সৌর বিদ্যুত্। সৌর বিদ্যুত্ উত্পাদিত হয় সূর্যের আলো থেকে। দিনের বেলায় সৌরশক্তিকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে সেই শক্তিই ব্যবহার করা হয় বিদ্যুত্ হিসেবে—গৃহস্থালির রান্নাবান্না, বাতি জ্বালানো, ফ্যান চালানো ইত্যাদি কাজে। সৌর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে বেশ কিছু পশ্চাত্পদ এলাকা; বিশেষ করে যেখানে বিদ্যুত্ যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, তেমন অনগ্রসর এলাকায়ও সৌর বিদ্যুত্ আশা ও সম্ভাবনার স্ফূরণ ঘটিয়েছে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে। চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখানে প্রয়োজনীয় বিদ্যুত্ উত্পাদন করা এখনও সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুত্ হতে পারে সম্ভাবনাময়। ইতোমধ্যে এ সম্ভাবনার আভাস সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের অনেক প্রত্যন্ত গ্রাম, চর ও পাহাড়ি এলাকায় এখন রাতে সৌরবিদ্যুতে বাতি জ্বলছে। এ ছাড়াও বৈদ্যুতিক পাখা ও টেলিভিশন চালানোর কাজে সৌরবিদ্যুত্ এসব এলাকার মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একের পর এক এই সুবিধা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা এলাকায়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশের মতো একটি সৌর আলোকিত দেশে সারা বছরই পর্যাপ্ত পরিমাণ সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব। এখানে বছরের তিন শ’ দিনের বেশি সময় রোদ থাকে। ইউরোপ ও আমেরিকার খুব কম দেশেই সারা বছর এমন রোদ থাকে; কিন্তু সেখানে কার্যকর অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক বেশি সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদিত হয়। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে সৌরবিদ্যুত্ প্যানেল স্থাপনে রয়েছে নানা সুযোগ। এর খরচও মোটামুটি সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে। সৌরবিদ্যুতে লোডশেডিং-এর ঝামেলা নেই। চাহিদা অনুযায়ী সব সময়ই বৈদ্যুতিক সুবিধা পাওয়া যায়।
বর্তমানে নওগাঁ ও যশোরসহ কিছু এলাকায় সৌরবিদ্যুত্ চালিত পাম্পের সাহায্যে সেচকাজ চলছে। এভাবে সেচকাজ করা সম্ভব হলে বছরে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হবে। এর ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এই ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ বন্ধের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা রাখা সম্ভব। কারণ সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে পরিবেশবান্ধব। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সমপ্রসারণের পথে যেসব বাধা রয়েছে তা চিহ্নিত করা দরকার। ডিজেল বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের জন্য পরিবেশগত যে সমস্যা রয়েছে; সৌরবিদ্যুত্ প্যানেল স্থাপনে সেসব সমস্যা নেই। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুেক আরো সুলভ করা সম্ভব। এ ব্যাপারে আমাদের অধিকতর উদ্যোগী হওয়া দরকার।
ঢাকা
