পৃথিবীজুড়ে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর ধনী দেশগুলোর দায় সবচেয়ে বেশি সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরাও তো তাদের পথেরই অনুসারী হয়ে উঠছি। ধীরে ধীরে যে ধরনের সামাজিক অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ আমরা গড়ে তুলছি এবং অভ্যস্ত হয়ে উঠছি, তাতে প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছেদ বেড়েই চলেছে। আগে আমরা শীতল পাটিতে বসতাম, মাটির হাঁড়িতে রান্না করতাম, মাটির চুলা ব্যবহার করতাম, পায়ে হেঁটে, গরুর গাড়িতে যাতায়াত করতাম। বৃষ্টির পানি রুখতে ছাতার বদলে কচুপাতা ব্যবহার বন্ধ হয়েছে তাও তো কতকাল। এখন যে জীবনে আমরা অভ্যস্ত তার সবটাই জ্বালানিনির্ভর। প্লাস্টিক, গ্যাস, বিদ্যুতের সীমাহীন ব্যবহার প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্কে ছেদ ঘটিয়েছে। প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কি আমরা পেছনে ফিরব? নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু সামনে দৌড়াতে গিয়ে যেভাবে প্রাণবৈচিত্র্য হারাতে হচ্ছে, যে দুঃসহ তাপমাত্রা সহ্য করতে হচ্ছে এবং এর সামনে আরো যে কত বড় ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখোমুখি আমাদের হতে হবে তাও কি একটু বিবেচনায় রাখা উচিত নয়? বাংলার প্রাণবৈচিত্র্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিস্ময়কর বৈচিত্র্যময় বৃক্ষ। ধু ধু জলরাশি থেকে শুরু করে একচিলতে ক্ষীণ স্রোত কোথায় নেই বৃক্ষ? সামান্য একটু স্রোতের বাঁকেও সবুজ শ্যাওলা জন্মে। শ্যাওলার ফাঁকে জন্মে কলমি ফুল। দর-দালানে সিমেন্টের ভাঙা ফাটলে উঁকি দেয় কালমেঘ, বনবিছুটি, বটের নানান শ্রেণি। ভাঙা পাঁচিলের ঘুলঘুলির মধ্যে অনায়াসে বেড়ে ওঠে কত অজানা তৃণ-গুল্ম-লতা। পুকুর ধারের এক টুকরো ঝোপের কাছে শ্যাওড়া কিংবা তালগাছহীন এমন গ্রাম ছিল বিরল। মাঠের মাঝে ঝাড় শিমুল, পলাশ, তমাল। এই তিনটিই এখন বিরল গাছ। শিমুল গাছের তুলো এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৃষ্টি। এখন সারাদেশে শিমুল গাছ কটা আছে তা বোধহয় গুনে বের করা যায়। তালগাছ, উঁচু বৃক্ষরাজির অভাবে কীভাবে বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে তা তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। বিশ্বে অতুলনীয় বাংলার মাটি। এখানে এক টুকরো ঝোপঝাড়ের মধ্যে অবলীলায় জন্মে উলুখড়, বনকলমি, সোঁদাল। কোনোরকম যত্ন ছাড়াই তৈরি হয়ে যায় জলবিছুটি, অর্জুনের জঙ্গল। বিনা আয়াসে মাটির নিচে জন্মায় কচু, ওল, মেটেআলু। দু-একফোঁটা বৃষ্টিতে চকমকিয়ে ওঠে বনকলমির সবুজ পাতা। যেখানে সেখানে জন্মাচ্ছে হোগলা, শোলাগাছ।
বাড়ির অদূরে এক টুকরো নির্জন বাঁশবাগান যত অবিশ্বাস্যভাবে তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলতে পারে, লক্ষ টন এসির পক্ষে তা সাধ্যাতীত। পর্যাপ্ত গাছ থাকলে এসি কেন, জলছাদেরও প্রয়োজন হতো না। বিশ শতকে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের দীর্ঘ বেলার সূর্যতাপ বেলা গড়ালে বিশুদ্ধ হাওয়ার নির্জন ছায়াভরা বিকাল হতে পেরেছে শুধু বৃক্ষের কল্যাণে। শুধু কি তাপমাত্রাই কমিয়েছে? গলার খুশখুশে কাশি থেকে মুক্তি পেতে ঘৃতকুমারির পাতা, রক্তবন্ধে কুকুর শোঁকা পাতা, জ্বর কমাতে গন্ধবেড়ালির পাতা, বদহজম দূর করতে খৈয়া বাবলার পাতা, সাইনাসের ব্যথায় চন্দ্রমল্লিকার পাতা— বৃক্ষের ভেষজ ব্যবহারের কোনো শেষ নেই। কিন্তু দুনিয়াজোড়া অ্যালোপেথিক চিকিত্সার এক মেরুকরণে হারিয়ে গেছে অসুখে বিসুখে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ভেষজের ব্যবহার। আজকের সমাজে আমাদের যে অসহিষ্ণুতা, অসহনশীলতা এবং পারস্পরিক আগ্রাসী ব্যবহার তার বড় কারণও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা। যে হতভাগ্য ভোরে ঘুম থেকে উঠে দূর্বা-শ্যামল মাঠে হাঁটার সুযোগ পায় না, নিবিড় হিজল বন দেখে চোখের ক্লান্তি দূর করতে পারে না, বৈশাখের ছায়াঘন দিনে বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধের ঘ্রাণ নিতে পারে না, অঘ্রাণ রাতে টিনের চালে শিশির পতনের শব্দ শুনতে পায় না, নিস্তরঙ্গ নদীর ওপর যার পূর্ণিমা দেখা হয়নি, যে নগরে শুক্লপক্ষের জ্যোত্স্নায় ভেজা যায় না, মোদ্দা কথা প্রকৃতির একটিও স্নিগ্ধ দৃশ্য যেখানে দেখার সুযোগ নেই, সে কেমন করে নম্র হবে? যে প্রজন্ম বর্ষণ ক্ষান্ত সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ের তলায় জোনাক জ্বলার দৃশ্য দেখেনি কিংবা দুরন্ত দুপুরে মাছ ধরার দোয়াড়ি পাততে গিয়ে ঝিরঝিরে হাওয়ায় বুনো ফুল লতাপাতার অচেনা গন্ধ পায়নি অথবা বিকালের নরম আলো সন্ধ্যার মুখে আরো ফিকে হয়ে, মিলিয়ে যেতে যেতে বাঁশঝাড়ের আগায় কীভাবে একচিলতে আবছায়া হয়ে আটকে থাকে তা যারা দেখেনি তারা দুর্ভাগা ছাড়া কী! এই নগরের নতুন প্রজন্মের জানাই হলো না চাঁদ নয়, তারার আলোতেও পথ চেনা যায়। কীভাবে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনজনিত ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারি আমরা।
তাপমাত্রা কমানোর জন্য আমাদের হাতে সবচেয়ে ভালো যে উপায়টি আছে তা হলো বেশি বেশি করে গাছ লাগানো। কংক্রিটের দালানের ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় গাছপালা থাকলে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করে বাঁকাভাবে। স্বাভাবিকভাবেই একই কথা বলা যায় রাস্তার দু ধারে ফুটপাতের গাছের ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমাদের গাছ এত কম, ইমারত এবং যানবাহন এত বেশি যে রাস্তায় নেমে আমরা হাঁসফাঁস করি।
আগামী পয়লা জুন থেকে শুরু হচ্ছে বর্ষা মৌসুম। যদি একটু হলেও আমরা উপলব্ধি করতে পারি কী ভয়ঙ্কর প্রক্রিয়ায় আমরা অস্বাভাবিক জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছি, তাহলে আমাদের উচিত বেশি বেশি গাছ লাগানো। বৃক্ষ সেই নীলকণ্ঠ প্রাণ যে নিজের শরীরে সমস্ত বিষ ( কার্বন) শুষে নিয়ে বাতাসকে বিশুদ্ধ করে আমাদের প্রাণে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই বৃক্ষকেই আমরা কারণে অকারণে কেটে ফেলছি। বৃক্ষের প্রাণ আছে, কাটলে সে কষ্ট পায়, জগদীশ চন্দ্রের এই ধ্রুব সত্যেও আমাদের মুনাফাপ্রবণ মন একটুও গলে না। যে কোনো অজুহাতে গাছ কেটে ফেলি আমরা। কখনো অজুহাত ছাড়াই কাটি। এই বাণিজ্যিক প্রবণতা থেকে মহীরুহরাও রক্ষা পাচ্ছে না। অথচ বৃক্ষের সঙ্গে প্রাচ্য অঞ্চলের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতিনির্ভর নয়, সংস্কৃতিনির্ভরও। অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে ধ্যান করে গৌতম বুদ্ধ বোধিপ্রাপ্ত হয়েছেন। গলায় আঁচল দিয়ে তুলসি তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শাঁখ বাজানোর দৃশ্যের সঙ্গে আমাদের স্নিগ্ধ শৈশবের স্মৃতি জড়িত।
চর্যাপদের দোহা এবং প্রাচীন সাহিত্যে লক্ষ্য করি, শবর নারীদের গলায় সুগন্ধী ফুলের মালা, চুলে তিল পাতা, কানে রিঠা ফুল এবং হাতে পদ্ম ডাঁটার বালা। প্রাচীন তুরস্কে বার্তা আদান প্রদানে ছিল পুষ্পলিপির ব্যবহার। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বেলপাতা, সৃষ্টি স্থিতি, প্রলয়, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের প্রতীক [উদ্ভিদ, উদ্যান, ঐতিহ্য : দ্বিজেন শর্মা]।
পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়ায় নদীর তীর, গাছের ছায়া, মাঠের বাতাস, আমের মুকুলের গন্ধ, পাখির ডাক, এসবের আর্থিক মূল্য কীভাবে নির্ধারণ হয় জানি না, কিন্তু শীতল ছায়া, প্রসন্ন সকাল, স্নিগ্ধ সন্ধ্যা, বসন্তের দখিন হাওয়া এসব না থাকলে, জীবনীশক্তি কমবে, কাজের আগ্রহ কমবে, জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। আমাদের স্নেহময়ী নদীগুলো না থাকলে কীভাবে রচিত হবে গান-গল্প-কবিতা? বৃক্ষ ছাড়া কোথায় পাব এমন অগাধ প্রশান্ত আশ্রয়? বিশুদ্ধ বাতাস ছাড়া আমাদের জীবন কি এক করুণ কাহিনী হয়ে উঠবে না?
n লেখক : প্রাবন্ধিক
