অমুকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে জামা কিনেছে, আমার তাই ১৪ হাজারের জামা কিনতে হবে। অমুকে জামার সঙ্গে জুতোও কিনেছে তাই আমার সোনার গহনা মাস্ট চাই! এগুলো বাংলাদেশের চিরায়ত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর উত্সবকালীন ঘটনা। আমার কথা শুনে আপনার কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে।
বাংলাদেশ উত্সবের দেশ। উত্সব এই দেশের প্রাণ। বাংলাদেশের প্রধান উত্সবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—পহেলা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, দুর্গাপূজা। সারাবছর আমরা যখন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত তখন উত্সবগুলো আমাদের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়। এনে দেয় আনন্দের উত্স।
কিন্তু উত্সবকালীন সময়েই আমরা মেতে উঠি ঠান্ডা প্রতিযোগিতায়। কখনো ভেবে দেখেছেন সাময়িক শান্তির জন্য আমরা কি সৃষ্টি করি!
খেয়াল করলেই দেখবেন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সব ঈদের আগমুহূর্তে বেড়ে যায়। কারণ অপরাধীরা ভাবে সেই সময়টাই মানুষের হাতে প্রচুর টাকা থাকে। টাকা হোক বোনাসের টাকা বা ঋণের টাকা।
আবার আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে কিছু মানুষ এই প্রতিযোগিতার সমাজে টিকতে এবং তার পরিবারকে টেকাতে এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবছর উত্সবগুলোর সময় আত্মহত্যার খবর যেন এখন নিয়মিত। সামান্য কাপড়ের প্রতিযোগিতায় টিকতে মানুষ নিজেকে শেষ করে দিতে পর্যন্ত ভাবে না! এতে করে আমরা কি লাভ পাচ্ছি? নাকি অন্যকে লাভবান করছি?
হ্যাঁ এতে করে লাভবান হয় বড় বড় কোম্পানিগুলো। আপনি আত্মহত্যা করলেন আর নিউজ আসবে ‘অমুক কোম্পানির বা অমুক সিরিয়ালের নামের পোশাক কিনতে না পেরে তরুণীর আত্মহত্যা।’ নিজে মরলেন! কিন্তু আপনাকে কেউ মনে রাখবে না। সবাই মনে রাখবে কোম্পানি বা সিরিয়ালগুলোর নাম। বেড়ে যাবে কোম্পানিগুলোর বিক্রি, সিরিয়ালগুলোর দর্শক। আর হারিয়ে যাবেন আপনি। মানে নিজের জীবন দিয়ে আপনি বিনে পয়সায় তাদের বিজ্ঞাপন করে দিয়ে গেলেন।
ঘটনা শুধু এখনেই শেষ নয়। এরপর কোম্পানিগুলোর নামে বের হবে আরো অনেক নকল কোম্পানি। যেখানে কমদামি ভেজালযুক্ত কাঁচামাল এবং দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার করে তৈরি করা হবে কাপড় এবং কসমেটিকস। এসব কাপড় ব্যবহারের দুদিনের মধ্যে দেখা যাবে কাপড় নষ্ট হয়ে যাবে, কসমেটিকসগুলো ব্যবহার করে হবে ভয়াবহ স্কিন প্রব্লেম।
আর সিরিয়াল একটা শেষ হতেই, নতুন নামে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে আগের সিরিয়ালের কাহিনী দিয়েই শুরু হবে নতুন সিরিয়াল।
এসব তো বলললাম কাপড় এবং সৌখিনতার প্রতিযোগিতার কথা। লজ্জিত সবচেয়ে বেশি হই যখন দেখি খাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়।
পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে ৩ বেলা খাবার মানে মানুষের কাছে স্বপ্ন।
আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখে ইলিশ বিক্রি হয় হাজার হাজার টাকা দামে। আর তা খাদ্য প্রতিযোগিতার জন্যই তখন আমরা কিনে খাই।
খাদ্য নিয়ে আপনাদের এসব নিচু প্রতিযোগিতায় ফায়দা নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে চড়াদামে বেচতে সাহস পায়। উত্সবের সময়গুলোতে চড়াদাম এবং ভেজালের হিরিক পড়ে।
শুধু বড় উত্সবগুলোতে নয়। ছোট উত্সবগুলোতে খেয়াল করুন। যেমন অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখা শুধু সামাজিক প্রতিযোগিতায় টিকতে একজন বাবা বিশাল বড় ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করছেন। এতে করে কি কোনো লাভ হচ্ছে! বরং যৌতুকের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ার এটা একটা বড় কারণ।
আমরাই কি উত্সবগুলোকে প্রতিযোগিতার মাধ্যম বানিয়ে, অপরাধ কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করছি না? উত্সব থাকুক না নির্ভেজাল আনন্দের উত্স হয়ে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
