সুন্দরবনে যথেচ্ছ ভ্রমণ চলবে না

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৪, ২২:০৩
সুন্দরবন ভ্রমণে নিয়ন্ত্রণ আরোপে সুন্দরবন পর্যটন নীতিমালা চূড়ান্ত হয়েছে। সম্প্রতি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে পর্যটক সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ রক্ষায় সুন্দরবন পর্যটন নীতিমালার আবশ্যকতা সৃষ্টি হয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পর্যটনের মাধ্যমে এ বনের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং বনজ সম্পদের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা হ্রাস করে তাদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, বাঘের আবাসভূমি ও সমৃদ্ধতম জীববৈচিত্র্য বিশ্ব বাসীর কাছে তুলে ধরে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা প্রণীত নীতিমালার উদ্দেশ্যর অন্যতম। পাশাপাশি সুন্দর বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও কৌশল, সংস্কৃতি, জীবনযুদ্ধ, প্রাচুর্যহীন জীবনে আত্মতৃপ্তি, দৃঢ় মনোবল, ঝুঁকি বহনের ক্ষমতা ও বিনোদন তুলে ধরা এবং সুন্দরবনে অতিরিক্ত এবং অপরিকল্পিত পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করা ও পর্যটনের ক্ষতিকর প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখাসহ পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধান ও সুন্দরবন ভ্রমণকে উপভোগ্য করে তোলাকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এ রূপ ছয়টি উদ্দেশ্য নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। সুন্দরবন পর্যটন নীতিমালায় ১৭টি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বিঘ্নকারী পর্যটনরোধকে নিশ্চিতকরণে অগ্রাধিকার প্রদান অন্যতম। পর্যটকবাহী জলযান, রুট, ধারণক্ষমতা, ভ্রমণ ফি, রাত যাপন, খাদ্য-পানীয় মজুদ, মাইক বা মাইক্রোফোন জাতীয় শব্দযন্ত্র নিষিদ্ধ, আগ্নেয়াস্ত্র, ধারাল হাতিয়ার, ফাঁদ ও বিষ বা মাছ ও বন্যপ্রাণী শিকার বা ধরার সরঞ্জাম বহন নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি নীতিমালায় মুখ্য বিষয় হিসাবে যুক্ত করা হয়েছে। সুন্দরবন ভ্রমণকালে প্রচলিত বন আইন, বন্য প্রাণী আইন, সংশ্লিষ্ট বিধি এবং বন কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলা, যত্রতত্র অবতরণ-বিচরণ-অবস্থান নিষিদ্ধ, সীমাবদ্ধ ধারণক্ষমতার মধ্যে পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দান ইত্যাদি বিষয় রয়েছে। সুন্দরবন পর্যটন নীতিমালায় পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও বনবিভাগের দায়িত্বের পরিধি উল্লেখ রয়েছে। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য তিনদিন আগে বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ, নির্দিষ্ট বন স্টেশনে জলযান নিয়ে রাজস্ব পরিশোধ, অভয়ারণ্য এলাকায় পৃথক এন্ট্রি ফি প্রদান, বন অতিরিক্ত অবস্থানের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে ফি প্রদান, জলে বা স্থলে বর্জ্য না ফেলা ইত্যাদি পর্যটকদের দায়িত্ব হিসাবে নীতিমালায় বলা আছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হ্রাসকৃত রাজস্ব পরিশোধে প্রতিষ্ঠান প্রদানের নিজস্ব প্যাডে ভ্রমণকারীদের তালিকা অনুমোদন, ৩০ শিক্ষার্থী প্রতি একজন শিক্ষক অভিভাবক নিয়োগ, সুন্দরবন ভ্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে সর্তকতা, জল-স্থলে বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ সম্পর্কে সচেতনতা, দলছুট অবস্থায় একাকী চলাফেরা না করা, সাগর-নদী-খালের পানিতে গোসল করা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি পর্যটকদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে। ট্যুর অপারেটরদের পরিবেশ সম্মত নিরাপদ জলযান, মানসম্মত খাদ্য ও পানীয় নিশ্চিতকরণ, শয়ন-বিশ্রাম পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা, জেনারেটর বহনে বিশেষ অনুমতি গ্রহণ, অনুমোদিত সময় জেনারেটর ব্যবহার, সৌরশক্তি ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। ঊর্ধ্বে ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের জলযানে রাতে সর্বাধিক ৭৫ জন পর্যটক থাকার অনুমতিসহ জলযানে ছোট নৌকা, এক থেকে দুইজন প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া নতুন নীতিমালায় বর্তমানে সুন্দরবন ভ্রমণে বন বিভাগ ট্যুর অপারেটরদের যে সব বিধি নিষেধ আরোপ করেন তাও বলবত্ থাকবে। বন বিভাগের দায়িত্বের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে সরকারি ছুটির দিনসহ সপ্তাহে প্রতিদিনই অফিসে সুন্দরবনে ভ্রমণে যাওয়ার আবেদন ও অনুমতির সুযোগ দান, পর্যটকবাহী জলযানগুলিকে নির্দিষ্টকরণসহ বন আইন বা বন্যপ্রাণী আইন পরিপন্থি কার্যক্রম প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, নীতিমালার শর্ত ভঙ্গকারী জলযানের সুন্দরবন ভ্রমণের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল বা জরিমানা আদায় করা, সুন্দরবন ভ্রমণের রুট নির্ধারণ ইত্যাদিসহ বেশ কয়েকটি দায়িত্ব নতুন নীতিমালায় বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। গত ২ জুলাই পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠিত সভায় নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়। মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাগণ ছাড়াও বন বিভাগ, র্যাব, পুলিশ, কোষ্টগার্ড, পর্যটন করপোরেশন, পর্যটন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর, ট্যুর অপারেটর প্রভৃতি পক্ষের প্রতিনিধিরা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। নতুন নীতিমালায় সুন্দরবনে যথেচ্ছ ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা অবলম্বনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে একটি জলযানে সর্বোচ্চ ৫০ জন পর্যটক বহনের দিবারাত্রি সার্ভিসে ৭৫ জন বহন করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নীতিমালায়। তবে একদিনের ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি জলযানে সর্বোচ্চ ১৫০ জন ভ্রমণকারী অনুমতি পাবে।