যেকোনো মুহূর্তে গাজায় ইসরাইলি স্থল অভিযান

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৪, ২২:৩৫
ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে রকেট হামলার অভিযোগ এনে গাজা উপত্যকায় নির্বিচার বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। ‘জঙ্গিদের’ বিরুদ্ধে এবং নিজেদের ‘নিরাপত্তার’ জন্য বিমান হামলা পরিচালিত হচ্ছে বলে ইসরাইল দাবি করলেও যারা নিহত হচ্ছেন তাদের প্রায় সবাই বেসামরিক নাগরিক। এসব হামলার সাথে তাদের বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। নিহতের তালিকায় আছে নারী ও শিশুরাও। গত মঙ্গলবার গাজায় বিমান হামলা শুরু করার পর নিহতের সংখ্যা এ পর্যন্ত একশ’ ছাড়িয়ে গেছে। বহুসংখ্যক বহুতল বাড়িঘর ধুলোর সাথে মিশে গেছে। এই পরিস্থিতিতে যখন গাজার সাধারণ নাগরিকদের জীবন চরম হুমকির মুখে পড়েছে তখন সেখানে ইসরাইল স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের স্থল অভিযান মাত্র কয়েক ঘন্টা দূরে। ইসরাইলি সেনারা যেকোন মুহূর্তে গাজায় ঢুকে পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলেছেন, মাহমুদ আব্বাসের আশঙ্কা সত্যি হলে গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল পশ্চিম তীরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন ইসরাইলি সরকার তার বাহিনীকে গাজায় স্থল অভিযান চালাতে আনুষ্ঠানিকভাবে চুড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। ফলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই গাজার উদ্দেশে দেশটির স্থলবাহিনী যাত্রা শুরু করতে পারে। এদিকে, চারদিন আগে হামাস-ইসরাইল দ্বন্দ্ব শুরুর পর গতকাল প্রথমবারের মতো ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে লেবানন থেকে নিক্ষিপ্ত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত করেছে। এই ঘটনায় কোন ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলা ও কিরইয়াতের মধ্যবর্তী কেফার ইউভাল এলাকার কাছে ফাঁকা জায়গায় একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।’ তিনি আরো জানান, এটি একটি কামানের গোলা নাকি রকেট- সেনাবাহিনী এখনো তা জানতে পারেনি। এই হামলার পর ইসরাইল আরো জোরেসোরে প্রতিশোধের প্রস্তুতি শুরু করেছে। গত কয়েকদিন ধরে গাজার হামাস সমর্থকরা ইসরাইলে রকেট ছুড়লেও লেবানন থেকে কোনো প্রকার হামলা চালানো হয়নি। লেবানন থেকে রকেট হামলা হামাসের প্রতি প্রতীকী সমর্থনের জন্য চালানো হয়েছে নাকি অন্য কোনো পক্ষ এই ‘লড়াইয়ে’ হামাসের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তার পরিস্কার নয়। ওই একটি হামলার জবাবে ইসরাইল ২৫ দফা হামলা চালিয়ে প্রত্যুত্তর দেয়। এদিকে এএফপি জানায়, ইসরাইলি বিমান হামলায় গতকাল মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয়েছে আরো ৬ ফিলিস্তিনি। গাজার জরুরি বিভাগের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা জানান, রাফাহর একটি বাড়িতে বিমান হামলা চালানো হলে এক নারীসহ ৫ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারায়। এই হামলায় আরো ১৫ জন গুরুতর আহত হয়। এর আগেরদিন বৃহস্পতিবার সেখানে ছয় শিশুসহ নিহত হয়েছিল ২২ জন। নগরীর তেল আল-হাওয়া এলাকায় গতকাল অপর এক বিমান হামলায় আনাস আবু আল-কাস (৩৩) নামের এক ফিলিস্তিনি নিহত হন। এদিন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র দাবি করেন, অভিযান শুরু পর থেকে গাজা থেকে হামাসের নিক্ষেপ করা ৫৫০ টি গোলা ও রকেট ইসরাইলে আঘাত হেনেছে। এছাড়াও ১১৮টি রকেট ইসরাইলের আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে হামাসের রকেট হামলায় কোনো ইসরাইলি নাগরিক নিহত হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে গাজায় সংঘটিত সহিংসতার পর এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংস রক্তপাতের ঘটনা। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহ্বাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে গতকাল বলেন , ইসরাইল আমাদের ভূমি এবং দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চায়। তিনি আরো বলেন, ইসরাইলি সেনারা গাজা সীমান্তে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের তাদের বাড়িঘর ছেড়ে অনেক ভেতরে চলে যেতে বলেছে। এর অর্থ স্থল সেনারা শিঘ্রই সেখানে আগ্রাসন শুরু করতে যাচ্ছে । কিন্তু আমরা তাদের জানিয়ে দিচ্ছি, নিজের মাটি ছাড়ব না। এদিকে, হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে একটি অস্ত্রবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সহিংসতা বেড়ে চলার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টেলিফোন করে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেন, তার সরকার উভয় পক্ষের মধ্যে একটি অস্ত্রবিরতিতে পৌঁছতে মধ্যস্থতা করতে আগ্রহী। অপরদিকে, গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলার নিন্দা জানিয়েছে মিসর এবং তুরস্ক। অন্যদিকে বিবিসি জানায়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় যেভাবে বেসামরিক লোকজন মারা যাচ্ছে, তাতে করে সেখানে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে কিনা তা নিয়ে গুরুতর সংশয় দেখা দিয়েছে। কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই বলেছেন, ইসরাইলকে যে কোন অবস্থাতেই বেসামরিক মানুষজনকে টার্গেট করে হামলা বন্ধ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, এসব পরিসংখ্যান দেখে গুরুতর সংশয় দেখা দিয়েছে ইসরাইল আদৌ আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে কিনা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের যে কোন লংঘন হলে তা তদন্ত করে দেখা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে অস্ত্রবিরতির পর উভয় পক্ষ থেকে রকেট কিংবা বিমান হামলা বন্ধ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হতে শুরু করলে হামাসের রকেটের জবাবে ইসরাইল নির্বিচার বিমান হামলা শুরু করে। এসব হামলায় আশ্রয় ও স্বজন হারাচ্ছে কেবল গাজা নগরীর বেসামরিক নারী, পুরুষ ও শিশুরা।