কাকডাকা ভোর থেকে রাত দুপুর। অবিরাম কাজ। কারোরই ফুসরত নেই এতকুটু। না ব্যবসায়ী, না তৈরি পোশাকের কারিগর। ঈদ তাদের কাজকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে তরুণ-তরুণীদের ফ্যাশন জিন্স। তৈরি হচ্ছে অনেক বিদেশি নামি-দামি ব্র্যান্ডের প্যান্ট।
রাজধানীর বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে বাম দিকে ইমামবাড়ি কবরস্থানের পাশ দিয়ে দু’মিনিট যেতেই চোখে পড়বে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগর ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে এই গার্মেন্টস্ পল্লী। তৈরি পোশাক নির্মাণের ক্ষেত্রে রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে এখানে। জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ মানুষের।
স্বল্প মূল্য ও মানের দিক দিয়ে উন্নত হওয়ায় সারা দেশের পাইকারি কাপড় ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন কাপড় কিনতে। রাজধানীর এ্যালিফ্যান্ট রোড়, ইস্টার্ণ প্লাজা, পলঅয়েল সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটিসহ বিভিন্ন অভিজাত বিপণি বিতানে বিক্রি হচ্ছে এখানকার পণ্য। রফতানি হচ্ছে বিদেশেও।
ব্যবসায়ীরা জানান, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, চাহিদামতো গ্যাস-বিদ্যুত্ সরবরাহ পেলে অনেক দূর যাবে এই গার্মেন্টস্ পল্লী। এছাড়া চাঁদাবাজি ও যানজটের মতো সমস্যাগুলোর সুরাহা করতে হবে।
যেখান থেকে শুরু
মূলত: স্বাধীনতার পর শুরু হলেও কেরানীগঞ্জে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসার ঘটে আশির দশকে। এখন দিন দিন তা বাড়ছে। ইতিমধ্যে এখানে গড়ে উঠেছে ১০ সহস্রাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি তৈরি পোশাকের কারখানা। প্রায় ১৫ হাজার শো-রুম। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন শপিং মলও।
এছাড়া পূর্ব আগানগর ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নের আনাচে-কানাচে অস্থায়ীভাবে গড়ে উঠেছে আরো অনেক কারখানা। শুভাঢ্যা ইউনিয়নের হাসনাবাদ, মিরেরবাগ, চর-মিরেরবাগ, খেজুরবাগ, চর-খেজুরবাগ, কালীগঞ্জ, চরকালিগঞ্জ, কৈবর্ত্যপাড়া, চরকুতুব, চুনকুটিয়া ও শুভাঢ্যা আর আগানগর ইউনিয়নের পূর্ব আগানগর, বাঘাবাড়ি, ইস্পাহানি, নতুন শুভাঢ্যা, আমবাগিচা, ইমামবাড়ি, কদমতলী গোলচত্বর এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে কারখানা।
এসব কারখানায় জিন্স প্যান্ট ছাড়াও তৈরি হচ্ছে পায়জামা-পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, টি-শার্ট, শার্ট, ফতুয়া, বোরখা ও শীতবস্ত্র। তৈরি হচ্ছে আমেরিকার লি লেভিজ, ব্লু কালেকশন, ইতালির ভারসেস, আরমানি, চীনের কসমো, পিয়ারিম্যান ও লুসিলংসহ বিদেশের অনেক নামিদামি ব্র্যান্ডের পোশাক। জিন্সের প্যান্ট তৈরিতে রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে উঠেছে এই গার্মেন্টস্ পল্লী।
ঝুট থেকেও তৈরি হচ্ছে পোশাক
দেশি-বিদেশি নতুন কাপড়ের পাশাপাশি বড় বড় গার্মেন্টস্ কারখানার ঝুট থেকেও তৈরি হচ্ছে এখানকার পোশাক। সাধারণত: গাজীপুর, টংগী, সাভার ইপিজেড ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল থেকে সরবরাহকারীদের মাধ্যমে জিন্সের ঝুট ফেব্রিক্স সংগ্রহ করা হয়।
জুয়েল গার্মেন্টস্-এর মো: রফিকুল বলেন, কাপড় সংগ্রহের পর আট ধাপে একটি প্যান্ট তৈরি করা হয়। কাটিং মাস্টার কাপড় কেটে দিলে এরপর এ্যাম্ব্রয়ডারি, সেলাই, বোতাম লাগানো, আয়রন, প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধাপে একটি জিন্সের প্যান্ট তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, প্রতি পিস জিন্সের প্যান্টের কাপড় কাটার জন্য কাটিং মাস্টাররা ৫ থেকে ৬ টাকা করে নেন। প্যান্টভেদে কারিগররা নেন ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এছাড়া স্থায়ী কারিগরদের মাসিক বেতন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়।
সমপ্রতি সরেজমিনে এই গার্মেন্টস্ পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, বড়দের পাশাপাশি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও কারখানায় কাজ করানো হচ্ছে। মূলত: কম পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য তাদের কাজে নেয়া হয়েছে।
দাম কেমন?
এখানকার তৈরি পোশাকের চাহিদার পেছনে অন্যতম কারণ দামে সস্তা। তবে ঘাটতি নেই মানে।
ফাতেমা প্যান্ট ফেয়ারের মো: ইকবাল হোসেন বলেন, আমাদের এখানে তৈরি পণ্য শুধু দেশে নয়, বিদেশে তৈরি পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। বিদেশের অনেক দামি ব্র্যান্ডের পোশাক আমরা এখানে হুবহু বানিয়ে দিতে পারি। এছাড়া সাব কনট্রাক্টেও বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক এখানে তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, সর্বনিম্ন ৩শ’ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকায় এখানে তৈরি জিন্স প্যান্ট বিক্রি হয়। এসব প্যান্ট রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত বিপণি বিতানে ১ হাজার ৫শ’ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
নিউ আড়ং-এর কামাল হোসেন বলেন, শ্রমিকদের মজুরিসহ উত্পাদিত পোশাকের সাথে সংশ্লিষ্ট সব কিছুর দামই বেড়ে গেছে। ফলে উত্পাদিত তৈরি পোশাকের দামও বাড়ছে।
দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ
দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ গার্মেন্টস পণ্য সরবরাহ হচ্ছে এই কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টস পল্লী থেকে। প্রতিনিয়ত এ চাহিদা বাড়ছে। তবে এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও যাচ্ছে এখানকার উত্পাদিত শার্ট-প্যান্ট, পাঞ্জাবি ও থ্রি-পিস। কানাডা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত, মিয়ানমার, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে এখানকার তৈরি পোশাক যাচ্ছে।
এখানকার সমস্যা
মামা-ভাগ্নে গার্মেন্টস-এর ফজলুর রহমান বলেন, গার্মেন্টস শিল্পে চীন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। আমাদের ভালো মেশিন নাই, অপারেটর নাই যে কারণে আমরা তাদের থেকে পিছিয়ে পড়ছি
তিনি বলেন, ‘আমরা চাহিদামতো গ্যাস, বিদ্যুত্ সরবরাহ পাই না। এর প্রভাব পড়ে উত্পাদনে। সময়মতো মাল ডেলিভারি দিতে পারি না। এছাড়া বিদ্যুত্ সরবরাহ না থাকায় জেনারেটর ব্যবহার করলে উত্পাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়।’
কে এম গার্মেন্টস-এর মাসুদ শেখ বলেন, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ নেয়ার কোন সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকেও কোন সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তাহলে ব্যবসার প্রসার ঘটবে কিভাবে? এছাড়া হরতাল, অবরোধের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের দেশে লেগেই থাকে যে কারণে আমরা গত বছর কোন ব্যবসাই করতে পারি নাই।
চমক ফ্যাশনের শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার আমাদের মতো ক্ষুদ্র পোশাক তৈরিকারকদের দিকে নজর দিচ্ছে না। রফতানিমুখী বড় গার্মেন্টসের জন্য বিদেশ থেকে এক্সেসরিজ আনতে ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা থাকলেও আমরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’ তিনি বলেন, যানজট এখানকার প্রতিদিনের সমস্যা। এছাড়া চাঁদাবাজিসহ আরো বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে।
এদিকে এবার দশ রমজান পার হলেও এখনো জমে ওঠেনি এখানকার বেচাবিক্রি। তবে দু’চারদিনের মধ্যে জমে উঠবে এমন আশার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। জুয়েল গার্মেন্টস-এর মো: রফিক বলেন, গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এখনো কাটেনি।
কেরানীগঞ্জের এই গার্মেন্টস পল্লী সম্পর্কে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতি লি:-এর সহ-সভাপতি মো: নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ১৯৮০ সালে পূর্ব আগানগরে ১৫-২০টি দোকান নিয়ে যে গার্মেন্টস ব্যবসার শুরু তা মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে এক বিশাল গার্মেন্টস পল্লীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হয় এখানে। ঈদসহ বিভিন্ন উত্সব পার্বনে তা শত কোটি ছাড়িয়ে যায়।
তিনি বলেন, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করলেও এখানে কোন শ্রমিক অসন্তোষ নেই। তবে পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘাটে চাঁদাবাজির কথা শোনা যায়, এমন তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ব্রিজের দুই পাশে প্রশাসন পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করতে পারে। তবে সমিতির পক্ষ থেকে মার্কেটে আনসার দিয়ে প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
