তালায় জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশনের পথ নেই

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৪, ২১:৫০
‘নেট, পাটায়’ ভরে গেছে খাল তৈরি হয়েছে শতাধিক বাঁধ উচ্ছেদে নামছে প্রশাসন বর্ষার আগমন ঘটেছে মাত্র কিছুদিন হলো। অঝোর ধারায় বৃষ্টি এখনো ঝরেনি। কিন্তু অল্পস্বল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার অনেক স্থানে। মুষলধারে ভারি বর্ষণ হলে জলাবদ্ধতা প্লাবনে রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকরা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তালা উপজেলার দলুয়া, বাগডাঙ্গা, কুলপোতা, সোনা বাঁধাল, হরিণখোলা, মেছেরডাঙ্গা, দলুয়া, তালতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এসব এলাকার বিলগুলোতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলা। বিলের পানি বাড়ির উঠোন ছুঁই ছুঁই করছে। আবারো ঘরবাড়ি ছেড়ে হয়তো অনেককে চলে যেতে হবে উঁচু রাস্তার উপর অথবা অন্য কোথাও। হাজার হাজার বিঘা জমির ফসল সর্বনাশা জলাবদ্ধতা গ্রাস করবে। শত শত শিক্ষার্থীর লেখাপড়া থমকে যাবে। লণ্ডভণ্ড হয়ে ধ্বংস্তূপে পরিণত হবে গোটা এলাকা। এমনই আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে জলাবদ্ধ এলাকার মানুষেরা। কিন্তু পানি নিষ্কাশন হবে কীভাবে? পানি নিষ্কাশনের সকল পথই যে বন্ধ। তালা উপজেলার উত্তরে শালিখা নদী থেকে নেমে আসা দলুয়া খাল, কুলপোতা খাল, গাবতলা খাল, তালতলা খাল, বাগডাঙ্গা খাল, পোড়া হরিণখোলা খাল, সোনা বাঁধাল খাল, বড়বুড়ির খাল, বলুয়ার টপসহ সকল খাল প্রভাবশালীদের দখলে। পানি নিষ্কাশনের জন্য এসব খাল শালিখা নদী থেকে নেমে এসে বেতনার পুটিমারিতে মিলিত হয়েছে। এই খালগুলো ছাড়া পানি নিষ্কাশনের আর কোন পথ নেই। খালগুলো জনস্বার্থে এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রতিবন্ধকতাবিহীন থাকার কথা। কিন্তু খালগুলো তা নেই। কেউ মাছ ধরার পাটা দিয়ে, কেউ নেট জাল দিয়ে, কেউ আবার সরাসরি খালের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে তা দখল করে রেখেছে। এসব খালের যতদূর চোখ যায়, দেখা যায় কেবল নেট আর পাটা। শতাধিক স্থানে রয়েছে সরাসরি মাটির বাঁধ। পানি নিষ্কাশনের খালে বাঁধ দিয়ে প্রভাবশালীরা সেখানে মাছ চাষ করছেন। খালগুলোতে বাঁধ ও নেটপাটা দিয়ে পানি নিষ্কাশনের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে এলাকার এসব প্রভাবশালী ব্যক্তি। এলাকাবাসী জানান, প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এসব খালের জমি শ্রেণী পরিবর্তন করে বন্দোবস্ত দিয়েছে। অনেকে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কমকর্তাকে ‘নগদ নারায়ণে’ খুশি করে বন্দোবস্ত নিয়ে খালগুলো সাব-লিজ দিয়েছে। আর সাব-লিজ নিয়ে এলাকার প্রভাবশালীরা পানি নিষ্কাশনের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে। এলাকাবাসী আরো জানান, সোনা বাঁধাল এলাকার কতিপয় ব্যক্তি সরকারি খালে বাঁধ ও নেটপাটা দিয়ে পানি নিষ্কাশনে চরম বাধা সৃষ্টি করছেন। খাল উন্মুক্ত করার কথা বললেই এসব ব্যক্তি সাধারণ কৃষকদের ধমক দিয়ে বলেন, সরকারের কাছ থেকে খাল কিনে নিয়েছি। নায়েব আমাদের কাছে খাল বিক্রি করে দিয়েছে। এ খাল দিয়ে পানি সরানোর ক্ষমতা কারো নেই। এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তফা লুত্ফুল্ল¬াহ বলেন, জলাবদ্ধতা সাতক্ষীরাবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যা। এলাকাবাসীর সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনিও বলেন পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সাতক্ষীরায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডও অনেকাংশে দায়ী। যে বিলগুলো নদী থেকে ৭/৮ ফুট ছিল সেই বিলের খাল ও নদীর সংযোগস্থলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে যে স্লুইস গেট নির্মাণ করেছে তা বিল থেকে ৭/৮ ফুট উঁচু। অপরিকল্পিতভাবে এই স্লুইস গেট নির্মাণের ফলে নদী ও খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। সাতক্ষীরার প্রত্যেকটি নদী পাউবোর কারণে অপমৃত্যুর কবলে পড়ছে। শালিখা নদী থেকে পুটিমারি পর্যন্ত সকল খালের নেটপাটা ও বাঁধ উচ্ছেদে তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি জানান। এব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি খাল উন্মুক্ত করতে শনিবার জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জেলার প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরকারি জলাশয় প্রতিবন্ধকতামুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারি খালের বাঁধ নেট পাটা উচ্ছেদ অভিযানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ বিষয়টি মনিটরিং করবেন।