উজিরপুরে শোকের মাতম

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৪, ২২:৫০
সড়ক দুর্ঘটনায় একই এলাকার ১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেছে উজিরপুরের মানুষ। কেউ একসাথে এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। শুক্রবারের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। উপজেলা জুড়ে মানুষের মুখে এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর। গতকাল শনিবার হাজার হাজার মানুষ শেষবারের মত এক নজর দেখার জন্য নিহতদের বাড়িতে ছুটেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার মোঃ ইউনুস, বরিশাল জেলা প্রশাসক শহিদুল আলম ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নিহতদের বাড়িতে গিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন, ফেলেছেন চোখের জল। ইচলাদী বাজারের ব্যবসায়ীরা নিহতদের স্মরণে গতকাল দোকানপাট বন্ধ রেখে শোক র্যালি বের করেন। এসময় দু’ ঘন্টা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিলো। ঘাতক বাস চালকের ফাঁসি ও নিহতদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ, আহতদের সু-চিকিত্সার দাবি জানিয়ে তিনদিনের আল্টিমেটাম দেয়া হয়। দাবি পূরণ না হলে ব্যবসায়ী ও উজিরপুরের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি নিবে। নিহতদের মধ্যে বিএম কলেজে অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র মামুন আকন ও তার ফুপাতো ভাই হাকিম বেপারী, শিক্ষক নীল শরীফ, ইচলাদী গ্রামের রিকশাচালক হারুন হাওলাদার, ইজিবাইক চালক জুয়েল বিশ্বাস, হামদার্দ-এর কর্মচারী জাহাঙ্গীর, ধামুড়া গ্রামের টেম্পোচালক জাহাঙ্গীর, বাবুগঞ্জের রাকুদিয়া গ্রামের বাস হেলপার সোহাগ, গুঠিয়ার ডহরপাড়া গ্রামের মুন্নী বেগম, গুঠিয়ার আশোয়ার গ্রামের মুজাম্মেল মৃধাকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আহতদের মধ্যে অনেকেই বরিশাল শেবাচিম ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শী বিএম কলেজের ছাত্র নিহত মামুনের সহপাঠী আহত লিমন জানিয়েছেন, মামুন তার হাতেধরা ছিল, সে বেঁচে গেলেও মামুন চলে গেছে না ফেরার দেশে। তারা চার বন্ধু ইফতার পার্টিতে যোগদানের কথা ছিল। আলামিন ও শাওন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় থাকায় মামুন ও লিমন তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ওই এলাকায় এসেছিল। হঠাত্ তাদের উপর বাসটি উঠে গেলে লিমন মামুনকে টেনে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মামুন বাসের চাকায় পিষ্ট হয়। লিমন ছিটকে পড়ে রাস্তার অপর প্রান্তে। মুহূর্তের মধ্যে মানুষগুলোকে ও মিশুক, রিকশা, দোকানপাট চাপা দেয়ার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কে দায়ভার নেবে পরিবারগুলোর? প্রাইভেট শিক্ষক নীল শরীফ চিরদিনের জন্য চলে গেলেন না ফেরার দেশে। প্রিয় শিক্ষকের জন্য কাঁদছে তার প্রিয় ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। বিএসসি পাস করে চাকরি না পেয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে স্ত্রী-সন্তান ও অসুস্থ পিতার মুখের অন্ন জোগাতেন ইচলাদী এলাকার সদা হাস্যোজ্জ্বল সাদামাটা মানুষ নীল শরীফ। শুক্রবার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে তিনি ছুটিতে ছিলেন। সে সুবাদে ইচলাদী এলাকার একটি দোকানে মিলাদে অংশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঘাতক বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে শেবাচিম হাসপাতালে মারা যান। তার মৃত্যুর পর পিতা ইয়াসিন শরীফ (৮০) বাকরুদ্ধ। স্ত্রী খাদিজা ছেলে সিফাত (৮), ২ মাসের শিশুকন্যা শিফাকে নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াবেন? একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে স্ত্রী দিশেহারা। মুন্ডুপাশা গ্রামের জুয়েল বিশ্বাস পিতা মোফাজ্জেল বিশ্বাসের পথ অনুসরণ করে একটি অটোরিকশা ক্রয় করেছিল তাঁতী সমিতি নামক এনজিও থেকে ৭১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে। স্ত্রী রুমা, শিশু শান্তামনিকে নিয়ে ভালই চলছিল তার সংসার। শুক্রবার বিকেলে তিনজন যাত্রী নিয়ে শিকারপুর যাত্রার শুরুতে ঘাতক বাস তাকে চাপা দিলে যাত্রীসহ ছিটকে পড়ে। যাত্রী রিয়ন, রিফাত ও তার মা বেঁচে গেলেও জুয়েল শেবাচিম হাসপাতালে মারা যায়। পরিবারটি এখন নিঃস্ব। স্ত্রী রুমা ও কন্যা আশামনির আর্তনাদে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। মুন্ডুপাশা গ্রামের রিকশাচালক হারুন সংসারের একমাত্র পুরুষ ব্যক্তি। তার আয়ে চলত ৮ জনের সংসার। বৃদ্ধা মা ফুলবারু ও ৫ কন্যা সন্তানকে নিয়ে কোনমতে ডালভাত খেয়ে দিন কাটাত। বসতভিটা ছাড়া তার কোন জমি নাই। ৪ মেয়েকেই স্কুলে পড়াত। হারুনের পরিবার এখন অসহায়। বড় মেয়ে রিমা, মেঝ মেয়ে ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী সীমা, মেয়ে শিউলী মুক্তা ও তানিয়ার আর্তনাদে এখন ওই এলাকার মানুষের চোখের পানি ঝরছে। কে নেবে এই অসহায় পরিবারগুলোর দায়িত্ব?