চার বছরের জন্য বিশ্ব ফুটবলের রাজত্ব কে পাচ্ছে সেটা জানতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। জার্মানি কি তাদের ধারাবাহিকতার পুরস্কার পাবে নাকি আটাশ বছরের আক্ষেপ ঘুচবে আর্জেন্টিনার, জবাব পাওয়া যাবে সেই প্রশ্নেরও। একই সঙ্গে এই ম্যাচের ফলাফলই ঠিক করে দেবে, ফুটবল তার শত বছরের ইতিহাসে আরো একজনকে চিরস্থায়ী আসন দেবে কিনা। হ্যা, আর্জেন্টিনা আজ জিতলে কেবল এ যুগের সেরা নয়, সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসাবে ঠাই নেবেন ফুটবল ইতিহাসে। তবে, কঠিন ছকে আবদ্ধ জার্মানদের কৌশলকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা জেতাটা সহজ হবে না মোটেই।
টুর্নামেন্টের শুরুটা বিপরীতভাবে হয়েছিল দুইদলের। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে উড়িয়ে দিয়ে জার্মানির শুরুটা হয়েছিল আত্মবিশ্বাসীভাবে। অন্যদিকে, বসনিয়াকে হারালেও আর্জেন্টিনার শুরুটা অবশ্য ততটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। যদিও সময় গড়ানোর সাথে সাথেই নিজেদের আসল রূপে দেখা দিতে থাকে দুই গোলই। জার্মানি তাদের শুরুর আক্রমণাত্মক স্টাইল পাল্টে প্রথাগত কৌশল নির্ভর খেলা শুরু করে। আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানিকে দেখেছি পুরো খেলায় একটি মাত্র গোল ধরে রাখতে, আবার তারাই সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ডুবিয়েছে সাত গোলের লজ্জায়। এই বিপরীত ধর্মী দুইটি তথ্যই জার্মানির শক্তিমত্তা সম্পর্কে সবাইকে পরিষ্কার একটা ধারণা দিতে পারে।
জার্মানি সব সময়ই একটা ছকবদ্ধ খেলা খেলতে চায়। মাঠে তাদের প্রতিটি খেলোয়াড় কেবল নিজেদের কাজটাই ঠিকমতো পালন করতে মনোযোগী থাকেন। ফলে তাদের খেলায় একক নৈপুণ্যের চাইতে দলীয় সমঝোতাই বেশি নজর কাড়ে। এই একই কারণে জোয়াকিম লোকে কোন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। জার্মানদের মূল শক্তির জায়গা বলবো আমি। তারা সবসময়ই দল সাজায় এগারজনের সম্মীলিত অংশগ্রহণের কথা মাথায় রেখে। আমার মনে হয় একমাত্র গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ের বাদে দলের বাকি সবারই গোল করার ক্ষমতা আছে। এই টুর্নামেন্টে তেমনটাই দেখেছি আমরা। সেট পিস থেকে ম্যাট হামেলস, টনি ক্রুজরা গোল পেয়েছেন। মিরোস্লাভ ক্লোসা, টমাস মুলারের কথা বলাই বাহুল্য। গোল ঠেকানোর পাশাপাশি করার কাজটিও ভালভাবেই পারেন ফিলিপ লাম, বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগাররা। সব মিলে পরিপূর্ণ একটা স্কোয়াড তাদের। মূল একাদশের বাইরে দলের রিজার্ভ বেঞ্চও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে কোন খেলোয়াড় চোটের কারণে ছিটকে গেলেও তাদের শক্তির খুব একটা হেরফের হবে বলে মনে হয় না। একটা প্রশ্ন হয়তো অনেকের মনে আসতে পারে, জার্মানির এই টিম স্পিরিটের উত্স কোথায়? আমি বলবো এর একটি কারণ তাদের জাতিগত ঐক্য। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জোয়াকিম লোয়ের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে খেলছে তারা। একই কোচের সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে কোচের কৌশলের সাথে মানিয়ে নেয়াটা সহজ হয়েছে খেলোয়াড়দের। একই সঙ্গে লো বুঝতে পারছেন কাকে কোন পজিশনে খেলালে সর্বোচ্চ ফলটা পাওয়া যাবে। এই কারণেই মাঠে জার্মানিকে দেখলে মনে হয় তারা যেন একটা সুরে নেচে চলেছে। অতীত ইতিহাস, মানসিকতা আর আত্মবিশ্বাসের কথা ভাবলে কিছুটা এগিয়ে রাখতে হয় জার্মানিকেই।
আমার বিবেচনা বোধ যদিও জার্মানিকে এগিয়ে রাখছে কিন্তু হূদয় বলছে আজ হাসতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। প্রতিটি টুর্নামেন্টেই ব্যাখ্যাতীত কিছু বিষয় থাকে, যেগুলো কিনা অনেক ক্ষেত্রেই শিরোপার গতিপথ ঠিক করে দেয়। এই টুর্নামেন্টে সেই লক্ষণগুলো আমি আর্জেন্টিনার পক্ষে দেখতে পাচ্ছি। শুরু থেকেই তারা কিছুটা পরিস্থিতির আনুকূল্য পেয়ে আসছে। নিশ্চিতভাবেই এটা ফিফার আনুকূল্য নয়, বরং এটাকে খেলারই অংশ বলবো আমি। সেই গ্রুপপর্বে ইরানের বিরুদ্ধে নিশ্চিত একটা পেনাল্টি তাদের বিরুদ্ধে যেতে পারতো, কিন্তু রেফারির চোখ এড়িয়ে গেছে সেটা। গত ম্যাচের কথাই ধরুন, গঞ্জালো হিগুইন ওয়েসলি স্নাইডারকে বল ছাড়া যে ফাউলটা করেছিলেন সেটা লাল কার্ডও হতে পারতো। গ্রুপপর্বে প্রায় একই রকম একটি ফাউলে লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল ইকুয়েডরের অধিনায়ক আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়াকে। আমি বলছি না ভাগ্য তাদের সাহায্য করেছে, কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না ভাগ্য তাদের পক্ষেই ছিল। তবে তাদের অর্জনকে নিতান্ত সৌভাগ্য বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই।
আমরা অনেকেই কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলার কৌশল নিয়ে সমালোচনা করেছি টুর্নামেন্টের আগে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত সাবেলার কৌশলই তাদের এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। বিশেষত, সেমিফাইনালে সাবেলার কৌশল দেখে আমি মুগ্ধ। আর্জেন্টিনার কাছ থেকে এত নিখুঁত কৌশলগত খেলা আমার মনে হয় সমর্থকরাও আশা করেননি। প্রতিটি খেলোয়াড় কোচ যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন সেভাবেই খেলতে পেরেছেন। যদি সেই খেলার ধারাবাহিকতা আজ তারা ধরে রাখতে পারেন তাহলে তারা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিততে যাচ্ছে সন্দেহ নেই।
আর ট্রফিটা যার হাতে সবচেয়ে বেশি মানাবে নিঃসন্দেহে তিনি মেসি। ম্যারাডোনা একক কৃতিত্বে তার দেশকে ৮৬’র বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। মেসির সামনেও তেমন সুযোগ। প্রতিভার বিচারে হয়তো ম্যারাডোনার চাইতে খুব একটা পিছিয়ে নেই মেসি। তার ঘাটতি কেবল একটি জিনিসের, বিশ্বকাপ ট্রফি। আজ যদি সেটা হয়ে যায় আর্জেন্টিনা তো বটেই ফুটবল বিশ্ব নতুন এক মহানায়ক পেতে যাচ্ছে নিশ্চিতভাবে। দেখাই যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়!
