ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা এখন এক রক্তাক্ত জনপদ। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেখানে চলছে ইসরাইলের নির্বিচার বিমান হামলা। বিশ্ববিবেকের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চিরবিদায় নিচ্ছে নারী ও শিশুসহ নিরীহ ও অসহায় ফিলিস্তিনী। ইসরাইল অবশ্য দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য ইহুদী বসতির উপর রকেট হামলাকারী হামাস গেরিলা আস্তানা। যদিও গাজা থেকে নিক্ষিপ্ত ঐ সব রকেটে কেউ হতাহত হয়েছে কি-না জানা যায়নি। জাতিসংঘের হিসেবে, গাজায় ইসরাইলী বিমান হামলায় নিহতদের ৭৭ শতাংশই নিরীহ বেসামরিক। টানা কয়েকদিন ধরে সহস াধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বসে জরুরি বৈঠকে। সেখানে যৌথ বিবৃতি দিয়ে গতানুগতিক রীতিতে অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানানো হয়। গাজার সবগুলো হাসপাতালে তখন রক্ত-মাংসের উত্কট গন্ধ, আহতদের করুণ চিত্কার এবং স্বজন হারানোদের আর্তনাদ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়, যুগ যুগ ধরে চলা ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না।
গত মাসে তিন ইহুদী কিশোরকে অপহরণ ও হত্যার মধ্য দিয়ে বিবাদের শুরু। ঐ ঘটনার জন্য হামাসকে দায়ী করা হলেও তারা তা অস্বীকার করে। এরপরই ফিলিস্তিনের এক কিশোরকে অপহরণ করে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঐ ঘটনার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে হামাসসহ অবরুদ্ধ গাজার অধিবাসী। হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ইসরাইলে একাধিক রকেট নিক্ষেপ করে হামাস। তারপরই নির্বিচার শাস্তি নেমে আসে গাজার গোটা জনগোষ্ঠীর উপর- নিক্ষেপ করা হয় শতশত টন ক্ষেপণাস্ত্র। যেন ফিলিস্তিনীদের ভাগ্যবিধাতার আসনে ইসরাইল। কারণ দুনিয়ার এটাই একমাত্র সমস্যা, যেটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে সমাধান ছাড়াই। ইসরাইলী নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভভরে বলেছেন, বিশ্বের কোন শক্তিই গাজার এই অভিযান বন্ধ করতে পারবে না। উল্টো তিনি ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান তথা ঘরে ঘরে গিয়ে তল্লাশির হুমকি দেন। নেতানিয়াহুর এই ঘোষণার পরই গাজা সীমান্ত জুড়ে দেখা যায় ইসরাইলের বিস্ফোরক ভর্তি সাজোয়া ট্যাঙ্ক। যে কোন সময় গাজায় ঢুকে পড়বে তারা। সব ঘটনার বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরোটাই যে পরিকল্পিত তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ এটা পরিষ্কার যে, ইসরাইলের এই হামলা শুধুমাত্র হামাসের বিরুদ্ধে বা আত্মরক্ষার্থে নয়। ইসরাইলের আগের অভিযানগুলোতেও দেখা গেছে, হামলার শিকার নিরীহ ফিলিস্তিনীদের একটা বিরাট অংশ শিশু।
গাজায় যখন এমন রক্তারক্তি অবস্থা, মধ্যপ্রাচ্য তখন আরব বসন্ত সামলাতে ব্যস্ত। পশ্চিমা গণতন্ত্রের ট্যাবলেটে কারো কারো বদহজম হবার জোগাড়। এ বিষয়টিকেই কার্টুনে প্রকাশ করেছেন সৌদিআরবের আলোচিত জেবারটুন নামের এক কার্টুনিস্ট। তাতে দেখা গেছে, পেট্রোল পাম্পে অনিঃশেষিত জ্বালানি নিচ্ছে এক ইসরাইলী ট্যাঙ্ক। তেল পাম্পের গায়ে লেখা ‘আরব নিরবতা’। একইভাবে, আরব লীগের কার্যকারিতার সমালোচনা করছেন বিশ্লেষকরা। কয়েকদিন গড়িয়ে গেলেও ফিলিস্তিনে ইসরাইলী আগ্রাসনের ইস্যুতে রবিবার পর্যন্ত তারা বৈঠকে বসেছেন বলে শোনা যায়নি। তবে বসে নেই হামাস গেরিলারা। বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে ইসরাইলে তারা ছুঁড়ছে একের পর এক রকেট। যার অধিকাংশই ইহুদী বসতির মাটি স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ইসরাইলের রয়েছে অত্যাধুনিক আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। যার আওতায় টিকে রয়েছে গোটা ইসরাইল। হামাস গেরিলাদের নিক্ষিপ্ত রকেটকে আকাশেই ধ্বংস করার নিখুঁত ক্ষমতা রয়েছে আয়রন ডোমের।
যুগের পর যুগ আরব জনগণের একতার কষ্টিপাথর বলে বিবেচিত হচ্ছিল ফিলিস্তিন। কিন্তু ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর আরব বিশ্বে এই সংকট লোক দেখানো রাজনীতিতে পর্যবসিত হয়। সেই থেকেই মূলত অচলাবস্থার সূত্রপাত। সর্বশেষ ২০০২ সালে সৌদিআরব প্রস্তাবিত একটি শান্তি পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় আরব লীগের ২১ সদস্য দেশ। যার মূল কথা, ইসরাইলকে ১৯৬৭ সালের সীমানা রেখা মেনে চলতে হবে, তবেই শান্তি। কারণ শুরুতে ফিলিস্তিনীদের জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে সেখানে আবাস গড়লেও এরপর ঐ ইস্যুতে যতবার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়েছে, ততবারই গোটা আরব বিশ্বের পরাজয় হয়েছে। আর ততবারই ইসরাইল দখল করে নিয়েছে নতুন নতুন অঞ্চল। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনপুষ্ট ইসরাইল ঐ শান্তি প্রস্তাব মানতে এখন পর্যন্ত নারাজ। ২০০৬ সালে পিএলও এবং হামাসের মধ্যে চরম রাজনৈতিক বিভাজন ফিলিস্তিনীদের বেশ দুর্বল করে দেয়। আর এরপর আরব ঐক্যে চূড়ান্তভাবে ফাটল ধরায় আরব বসন্ত বা গণতন্ত্রের নামে গণজাগরণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে এমন পরিস্থিতিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ ২০০২ সালের নভেম্বরে সবাই যখন আরব নবজাগরণসহ নিজেদের সমস্যা নিয়ে মরিয়া, ঠিক সেই মুহূর্তে গাজায় পিলারস অব ডিফেন্স নামের রক্তাক্ত অভিযান চালায় ইসরাইল। আটদিনের ঐ নির্বিচার হামলায় মারা যায় ১৩০ জন ফিলিস্তিনী। আর এখন এমন সময় এই হামলা চালানো হচ্ছে, যখন ইরাকে সুন্নি গেরিলাদের সামলাতে এর চারপাশের দেশগুলো আর বিশ্বকাপ উন্মাদনায় গোটা বিশ্ব সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সৌদিআরবের কড়া সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনীদের সাহায্যে নয়, বাশার আল আসাদকে হটাতে ব্যস্ত রয়েছেন রিয়াদের বাদশাহ।
ইসরাইলের এই দফা অভিযানের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো সহিংসতা থামানোর কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর অভাব। এর আগে মধ্যস্থতাকারী না থাকায় ২০০৮-০৯ সালে গাজায় ইসরাইল কাস্ট লিড নামের যে অভিযান চালায়, তার মেয়াদ ছিলো টানা ২২ দিন। মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা বা যুদ্ধবিরতিতে মিসর সব সময়ই বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। দেশটির সাবেক একনায়ক হোসনি মোবারকের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম কারণও এটা। তাঁর পতনের পর ২০১২ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও মিসরের দ্রুত মধ্যস্থতায় আটদিনেই শেষ হয় ইসরাইলের পিলারস অব ডিফেন্স অভিযান। সে সময় মিসরের ক্ষমতায় ছিলেন দেশটির প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি। মুসলিম ব্রাদারহুডের এই নেতার সাথে হামাস এবং আরব লীগ নেতাদের সম্পর্ক ভাল ছিলো। আর মুরসির সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকায় এখন হামাসের সাথে মিসরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির সম্পর্ক ততটাই খারাপ। এ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর সংকট গাজার দুর্ভোগ আরো দীর্ঘায়িত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসরাইলের প্রবীণ দাম্ভিক নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যথার্থই বলেছেন, বিমান হামলা বন্ধ করবে, এমন সাধ্য এবার বিশ্বের কোন শক্তির নেই।
