কেমন হলো মোদীর প্রথম বাজেট

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২২:০১
কংগ্রেসের টানা দশ বছরের শাসন দেখেছে ভারতের মানুষ। কোথাও সফল হয়েছে কোথাও ব্যর্থ। জনগণের চোখে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই ধরা পড়ে বেশি। নির্বাচনী যুদ্ধে সেই সুযোগটা কাজে লাগায় বিরোধী দল। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তার প্রচারণায় একই কৌশল নিয়েছিল। কংগ্রেসের শাসন আমলে কিছু বড় বড় কেলেঙ্কারির কথা সামনে এনে বিপদে ফেলে দেয় সোনিয়া গান্ধীর দলকে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জনগণ তাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনলে ভারতবাসী উপহার পাবে ব্যতিক্রমী এক সরকার। এই সরকার হবে কেবলই জনগণের। দুর্নীতি চলে যাবে নির্বাসনে। আর সাধারণ মানুষ পাবে সুখের নাগাল। শুরুটা তাই বেশ দাপুটে ছিল বিজেপি’র। এমপি-মন্ত্রীদের নানা অন্যায্য সুবিধা বাতিল করে তাদের কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে বলেন। মোদী সরকারের বড় প্রতিশ্রুতি ছিল বাজেটে অভিনবত্ব উপহার দেয়া। মোদী বলেছিলেন, এই বাজেট হবে জনগণের বাজেট। এতে লাভবান হবে কেবল সাধারণ নাগরিকরা। সেই বাজেট পেশ হলো গত সপ্তাহে। কেমন হলো সেই বাজেট। মোদী সরকারের বাজেট নিয়ে ভারত ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নানারকম বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য এই বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি দাবি করেছেন, এই বাজেট প্রবৃদ্ধিকে উত্সাহিত করবে এবং কোষাগার ঘাটতির পরিমাণ কমিয়ে অর্থনীতির চাকাকে দারুণভাবে সচল করে তুলবে। নির্বাচনী প্রচারণায় মোদীর প্রধান ইস্যুই ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর সেই পটভূমিতে তার সরকারের প্রথম বাজেটে শিল্প মহল, শেয়ার বাজার ও সাধারণ মানুষ মোটামুটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই দেখিয়েছে। মোদীর ভোটের প্রচারে মূল স্লোগানটাই ছিল -‘আচ্ছে দিন আনেওয়ালে হ্যায়’। অর্থাত্ সুদিন শিগগিরই আসছে। কিন্তু সেই সুদিন মানে যে সরকারের একটার পর একটা জনপ্রিয় ঘোষণা নয়, বরং বেশ কিছু অপ্রিয় সিদ্ধান্তের জন্যও তৈরি থাকা, ক্ষমতায় আসার পর ভারতবাসীর প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। মোদী সরকারের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিও তার প্রথম বাজেটেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রবৃদ্ধির হার যে গত দু’বছর ধরে পাঁচ শতাংশেরও নিচে ঘোরাফেরা করছে সেটাকে সাত থেকে আট শতাংশে টেনে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। লোকসভায় বাজেট বক্তৃতায় জেটলি বলেন, প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে ভারতের এখন আর কোনো সঙ্কোচ নেই। দারিদ্র্যসীমার নিচে যারা আছেন তারা সেখান থেকে ওপরে উঠতে মরিয়া। যারা সেই কঠিন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন তাদেরও আকাঙ্ক্ষা প্রবল মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে ঢোকার। সমাজ যে সুযোগগুলো সৃষ্টি করছে, পরবর্তী প্রজন্ম তার সদ্ব্যবহারে উদগ্রীব, কিন্তু প্রবৃদ্ধির হার পাঁচ শতাংশেরও নিচে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি খুব কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জেটলি মন্তব্য করেন। মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী শ্রেণীর জন্য আয়কর ছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা নানাভাবে বাড়ানো হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলাতেই তিনি আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাজেটে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন, অবকাঠামো খাতে খরচ বাড়ানোর এবং জিএসটি বা পণ্য ও পরিষেবা কর চালু করার প্রস্তাব করেছেন। প্রতিরক্ষা ও বীমা খাতে বিদেশি লগ্নিও ২৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করা হয়েছে। খাদ্যশস্য এবং তেল-গ্যাসের মতো জ্বালানিতে ভর্তুকি ভারতে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। সেই ভর্তুকিও ধীরে ধীরে তুলে নেয়া হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ভর্তুকি এখন থেকে আরও টার্গেটেড বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য হবে, সেটা জানালেও বিস্তারিত কিছু অবশ্য ভেঙে বলেননি অর্থমন্ত্রী। সব মিলিয়ে ক্ষমতা নেয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট তৈরি করেছেন সেটা প্রশংসা করার মতোই বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাজেটটা খারাপ নয়-তবে, বড্ড বেশি মাথা ঘামিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। শুরুর বাজেটটি আরো সংক্ষিপ্ত হলে কাজ করতে সুবিধা হতো সরকারের। গঙ্গার ঘাট সংস্কার থেকে মূর্তি তৈরি, পুলিশ মেমোরিয়াল, হাসপাতাল কিছুই বাদ দেননি। এত বেশি দিকে নজর না দিলেও চলত, বাজেটটা অনেক সুসংহত এবং পরিচ্ছন্ন দেখাত। আসলে কোষাগার ঘাটতিতে রাশ টানার চেষ্টার পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে তার দেশের সব শ্রেণীকেই অল্প অল্প করে খুশি করার চেষ্টা করেছেন, তা বিশ্লেষকদের নজর এড়ায়নি। শহরের মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী শ্রেণীকে বিজেপি’র বড় সমর্থক বলে ধরা হয়, তাদের জন্য আয়কর ছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা নানাভাবে বাড়ানো হয়েছে। যদিও আয়করের হারে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এলসিডি টিভি বা ফ্রিজের ওপর শুল্ক অনেক ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে, উল্টোদিকে দাম বাড়ছে সিগারেট বা তামাকজাত পণ্যের। এক মধ্যবিত্ত গৃহিণী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, টিভি-ফ্রিজের দাম বাড়া-কমায় দেশের গরীব মানুষের কিছু আসবে-যাবে না। তাদের রোজকার জীবনধারণের জিনিসগুলোর দাম বরং নাগালে রাখাটা বেশি দরকার। তামাক বা অন্যান্য নেশা সামগ্রীর দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অনেকেই সমর্থন করেছেন, বলছেন দাম বাড়লে হয়তো এগুলো হাতের বাইরে থাকবে। জেটলি তার বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন, কোষাগার ঘাটতিকে তিনি জিডিপি’র ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনবেন। আগামী দুই অর্থবছরে এই শতকরা হার কমিয়ে ৩ শতাংশেও নিয়ে আসতে চান তিনি। আর তার কারণটাও তিনি বাজেটে স্পষ্ট করে বলেছেন, ভারতের আগামী প্রজন্মের কাঁধে সরকার কোনো দেনার পাহাড় চাপিয়ে দিতে চায় না। ইন্ডিয়া টাইমস তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বাজেটে প্রতিরক্ষা খাত, বীমাসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এফডিআই বা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে জোর দিয়েছে মোদী সরকার। নির্মাণ ক্ষেত্রেও এফডিআইকে স্বাগত জানানো হয়েছে। পুঁজি টানতে ন্যূনতম বিনিয়োগ দশ লাখ ডলার থেকে কমিয়ে পাঁচ লাখ ডলার করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকার ন্যূনতম আয়তন ৫০ হাজার বর্গমিটার থেকে কমিয়ে বিশ হাজার বর্গমিটার করা হয়েছে। মোটকথা সর্বমহলের গ্রহণযোগ্য বাজেট দেয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। মমতার প্রতিক্রিয়া: এদিকে, মোদী সরকারের প্রথম বাজেট অনেককে খুশি করলেও খুশি হননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি এই বাজেটকে ‘দিশাহীন, লক্ষ্যহীন ও কর্মহীন’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বাজেটে বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগও প্রয়োজনের তুলনায় কম করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পে যেখানে ১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে সেখানে ভারত জুড়ে চালু হওয়া ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্পে মাত্র একশ’ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। একইভাবে ভারতের ৫৫ কোটি তরুণকে নতুন সংস্থা খুলতে উত্সাহ দেয়ার জন্য মাত্র একশ’ কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে। এতে ভারতের তরুণ সমাজকে অপমান করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার অভিযোগ, বাজেটে পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত হয়েছে। বস্ত্রশিল্পে এই রাজ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এ বাজেটে যে নতুন ছয়টি বস্ত্র শিল্পাঞ্চলের কথা ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নাম নেই। মমতার দাবি, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উপরে বোঝা আরও বাড়িয়ে দেবে। এই বাজেট মোদী সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রমাণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ক্ষমতায় আসা মোদী তার প্রথম বাজেটেই ‘দিশা’ হারিয়েছেন।