দৌড়ের উপর আছে তালেবান!

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২২:০২
পাকিস্তানের আদিবাসী অধ্যুষিত উত্তর ওয়াজিরিস্তানের প্রধান শহর মিরানশাহ এখন যেন ভূতুড়ে শহর। কয়েকদিন আগেও এই মিরানশাহ ছিলো পাকিস্তানি তালেবানদের (টিটিপি) ‘রাজধানী’! সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না সেখানে। এই টিটিপি আফগানিস্তান সীমান্তসহ এই অঞ্চলের ছোট ছোট চরমপন্থী সংগঠনের আশ্রয়দাতাও ছিলো। কিন্তু এই মিরানশাহ এখন জনশূন্য। কোনো জঙ্গি নেই। বাজার কিংবা মার্কেটে নেই জন মানুষের দেখা। এ অবস্থা দেখে মনে হয়, স্থানীয়রা ও দোকানিরা একটু তাড়াহুড়ো করেই সব কিছু ফেলে চলে গেছে। বাজারের কিছু অংশের দোকান অর্ধেকটা খোলা। বিক্রির জন্য কিছু পণ্য এখনো দোকানে ঝুলছে। মনে হবে দোকানি নামাজের জন্য বা অল্প সময়ের জন্য বাইরে গেছে। এখন মিরানশাহের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। গত তিন সপ্তাহে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চালানো অভিযানে তালেবান জঙ্গিরা এই এলাকা ছেড়ে এখন পালিয়ে গেছে। যারা পালানোর সুযোগ পায়নি তারা মারা পড়েছে। সেনাবাহিনীর অভিযানের পর এই প্রথম দীর্ঘদিন পর কোনো সাংবাদিকের যাওয়ার সুযোগ হয়েছে জঙ্গিদের কেন্দ্রস্থল মিরানশাহতে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে গিয়েছিলো সেনাবাহিনী। যাদের মধ্যে ছিলেন বিবিসি উর্দুর একজন সাংবাদিকও। তার দেখা মিরানশাহের বর্ণনা হলো, শত শত অস্ত্র পড়ে রয়েছে সেখানে। সেনা আর সংবাদকর্মীদের মাঝে একটি বানরই কেবল চোখে পড়েছে। জঙ্গিদের এই শহরের দোকানে হরহামেশাই বিক্রি করা হতো আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহারের জন্য জ্যাকেট। সেগুলো এখন ধংস্তূপ। কিছুদিন আগে করাচির বিমানবন্দর জঙ্গি আক্রমণের শিকার হয়। সেখানে কিছু মানুষের মৃত্যুও পাশাপাশি পাকিস্তানের চরম নিরাপত্তাহীনতার অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে আসে। বিদেশিদের পাকিস্তান সফরেও এক ধরনের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা দেখা যায়। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে গত মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। তাদের অভিযান শুরু করেছিলো এই অঞ্চলকে টিটিপি ও তাদের শরিকদের থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এ কাজে অনেকটাই সফল হয়েছে সেনাবাহিনী। বিমান হামলার পর সন্দেহভাজন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করে সেনারা। যদিও বলা হচ্ছে, সেনা অভিযানের শুরুর আগেই অনেক জঙ্গি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে তালেবান জঙ্গিরা নিজেদের চুল-দাড়ি কেটে চেহারা পাল্টে ফেলে। উপজাতি অধ্যুষিত এ অঞ্চলের শহর মিরানশাহে সেলুনে কাজ করতেন এমন লোকদের তথ্য এটি। তাদের বক্তব্য অভিযানের মাসখানেক আগে থেকে জঙ্গিদের মধ্যে দীর্ঘ চুল ও দাড়িওয়ালা চেহারা একেবারে পাল্টে ফেলার ধুম পড়ে। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জাফর খান বলেন, এ অভিযানের পর জঙ্গিদের নেতৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ দুটোই ভেঙে পড়েছে। এটিই ছিলো জঙ্গিদের কেন্দ্রস্থল। স্থানীয় লোকেরা তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিলো। তিনি বলেন, এখানে জঙ্গিদের পালিয়ে থাকা শতভাগ অসম্ভব। তবে যদি কেউ পালিয়ে যেয়ে থাকে সে আর এখানে আসতে পারবে না। মিরানশাহের কিছু অংশে যুদ্ধের ছাপ রয়ে গেছে। সেনাবাহিনী বলছে জঙ্গিদের রকেট নিক্ষেপের কারণে এই অবস্থা হয়েছে। তাদের মতে, মিরানশাহকে জঙ্গিমুক্ত করার ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে উত্তর ওয়াজিরিস্তানকে জঙ্গি মুক্ত করতে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সাংবাদিকরা সেখানে জঙ্গিদের আস্তানা, মসজিদের নিজে বেসমেন্টে থাকার জায়গা, বোমা তৈরির কারখানাসহ অনেক কিছুই নিজেদের চোখে দেখেছে। এসব নজির বলে দিচ্ছে, জঙ্গিরা দ্রুত সময়ের মধ্যেই পালিয়ে গেছে। সেনারা এখানে এমিরেট অব আফগানিস্তান নামে লেখকের নাম-ঠিকানা পেয়েছে। যাকে তালেবান নিজেদের রাষ্ট্র বলে দাবি করে। বলা হচ্ছে, সেনা অভিযানের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ লোক তাদের ঘর বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। ইসলামাবাদের দক্ষিণ পশ্চিমের প্রায় ৩৭১ কিলোমিটার দূরের বান্নু এলাকার বস্তি ও তাঁবুতে এসব লোকের বাস। তাদের অভিযোগ এখানে ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে না। এখানে আসা প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা কাহিনী। এই অবস্থার মধ্যে তারা থাকতে চাইছে না। আবার বাড়িও ফিরতে পারছে না। এ অভিযান কতদিন ধরে চলবে সে বিষয়ে সেনা কর্মকর্তা খান কিছু নির্দিষ্ট করে বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা উচিত হবে না। আমরা জানি, এ অভিযান শুরুর পর থেকে অনেক লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু এখন আমাদের একসঙ্গে মিলেই এ কাজ করে যেতে হবে। পাকিস্তানকে জঙ্গিমুক্ত করা সম্ভব হবে কিনা সে নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। তবে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা এসব জঙ্গি সংগঠন সমূলে ধংস করা বা উত্খাত করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু দিনে দিনে পাকিস্তান যেভাবে জঙ্গিদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছিলো তাতে দেশটির কার্যকারিতা ও সরকারের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছিলো। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা বাড়ছিলো। তাই পাকিস্তানকে এ ধরনের একটি অভিযান চালানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এখন দেখার বিষয় যে, সেনাবাহিনী তাদের অভিযানে কতটা সফল হয়।