সিয়েরা লিওনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কেনেমায় রঙছাড়া এক কংক্রিটের বাড়ি। দু’দিন আগেও এ বাড়িটিতে হাওয়া দাবহ’র সঙ্গী ছিল আরো ২৫ জন। সে সংখ্যাটা এখন চব্বিশে নেমে এসেছে। প্রাণঘাতী এবোলা কেড়ে নিয়েছে হাওয়ার সত্বাবা আলফা লানসানাকে। এই কেনেমা শহরটি হীরার জন্য বিখ্যাত; কিন্তু ইদানীং এর নাম ছড়িয়ে পড়েছে ভিন্ন একটি কারণে। এবোলার সঙ্গে সংগ্রাম করার কারণে দেশ-বিদেশের অনেকেই জেনে গেছে এ শহরটির নাম। গত ৪ জুলাই পর্যন্ত গিনি, সিয়েরা লিয়ন ও লাইবেরিয়ায় এবোলায় নিহতের সংখ্যা ৪৬৭ জন আর সংক্রামিত হয়েছে অসংখ্য লোক। এর মধ্যে শুধু সিয়েরা লিওনে মারা গিয়েছে ৯৯ জন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট এরনেস্ট বাই করোমা শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, এবোলা বাস্তব, এবোলা মানুষ মারছে।
এবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জ্বরের পাশাপাশি মাথা, পেশি ও গলায় ব্যথা হয়। বমি ও ডায়রিয়াও হতে পারে। কিডনি ও লিভার ধীরে ধীরে অকেজো হতে শুরু করে। এটি শুধুমাত্র মানুষই মারছে না, ভয় ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে বন্ধুদের মাঝে, সম্প্রদায়গুলোকে বিভক্ত করছে, জীবিকাকে আঘাত করছে এবং থামিয়ে দিচ্ছে শিক্ষাকে। হাওয়ারা যেখানে থাকেন, শান্তিপূর্ণ উপশহরটির সবকিছুই এখন বদলে গেছে। এবোলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে চোখের জল আটকাতে পারছিলেন না হাওয়া, ‘এটি আমাদের উপর নিদারুণ প্রভাব ফেলছে। সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসছে না। আমাদের সকল শিশুকেই স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।’ পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ যে, এবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লোকের পরিবারটিকে থাকতে হচ্ছে একঘরে হয়ে। আলফা রানসানা মারা যাওয়ার পর হাওয়াদের পরিবারের সকল সদস্যকেই এ রোগের জন্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সবার বেলায়ই ফলাফল নেতিবাচক। তা সত্ত্বেও তাদেরকে যাপন করতে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন জীবন। এমনকি অতিঘনিষ্ঠ লোকজনও তাদের বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক প্রতিবেশী হুমকি দিচ্ছে এলাকা ছাড়া করার।
হাওয়ার খালা আমিনাতা স্থানীয় ক্রিও ভাষায় জানান, জীবন বড় কঠিন হয়ে গেছে তাদের। তিনি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে কাছের বাজারে রান্না করা খাবার বিক্রি করেন। বাজার থেকে আসার পথে একটি পাত্রের ঢাকনা খুলে দেখাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘কিছুই বিক্রি হয়নি। সংক্রামিত হওয়ার ভয়ে আমাদের তৈরি খাবার কেউ খায় না।’ এতে পরিবারটি বেঁচে থাকার উপায় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। লানসানাই ছিলেন তাদের পরিবারের মূল উপার্জনকারী। কাছের একটি হাসপাতালে ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানের কাজ করতেন তিনি। এবোলা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন এ রোগে।
ভয়াবহ তথ্য জানান কেনেমারই আরেক বাসিন্দা। তাদের পরিবারের এক সদস্য হঠাত্ করে অসুস্থ অনুভব করার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানানো হয়েছিল তার টাইফয়েড হয়েছে। এর পরের দিনই আবার জানানো হয়, টাইফয়েড নয়, তিনি এবোলায় ভুগছেন। এর মধ্যে সর্বনাশ যা হয়ে যায়। তার সংস্পর্শে আসা পরিবারের সাতজনই এবোলায় আক্রান্ত হন। রোগীসহ ওই সাতজনের চারজনই মারা গেছেন। বাকি তিনজনের চিকিত্সা চলছে। তাদের অবস্থাও ভালো নয়।
কেনেমায় এবোলায় আক্রান্ত হওয়াকে কলংক মনে করা হয়। হাওয়ার পরিবারের শিশুরা টেস্টে নিগেটিভ প্রমাণিত হলেও তাদেরকে কোনো সার্টিফিকেট দেয়া হয়নি। যে কারণে স্কুলের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হচ্ছে না। এবোলায় সবচে’ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীরা। আল জাজিরার সাংবাদিকরা কেনেমা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে দেখেছেন এবোলা ওয়ার্ডে ধর্মঘট চলছে; ডাক্তার ও নার্সদের কেউই নেই। একজন নার্স জানান, এম্বুলেন্সের চালকরা কোন রোগীকে আনতে চায় না। এরইমধ্যে তার ছয়জন সহকর্মী ও একজন নার্স এবোলায় সংক্রামিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। যে কারণে ডাক্তার ও নার্সরা এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য ঝুঁকি ভাতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। এখন প্রতি রোগীর চিকিত্সার জন্য ডাক্তার ও নার্সদের দেয়া হয় ১ লাখ লিওন (২৩ মার্কিন ডলার), যা কি-না মোটেও পর্যাপ্ত নয়।
সিয়েরা লিওনে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ডেভিড ম্যাকলাচলান-কার এবোলার তুলনা করেছেন শুরুর দিকের এইচআইভি/এইডস-এর সঙ্গে। অনেকে রোগটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। কেউ কেউ এর অস্তিত্বই স্বীকার করে না। এখন পর্যন্ত হাওয়া ও তার পরিবারও সে দলে। হাওয়া মনে করেন, তার বাবা আসলে মানসিক চাপে মারা গেছেন; এবোলা টেস্টে পজিটিভ জানার পরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। একই অভিমত হাওয়ার বোনের, ‘আমি জানি এর কোনো অস্তিত্ব নেই। আমি এখন পর্যন্ত এ রোগ দেখিনি।
এবোলা স্ক্রিনিং রুমে কাজ করা রাচেল মুসা জানান, সিয়েরা লিওনে এবোলা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মূলত দুটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বেশিরভাগ লোকই ভয়ে এ রোগের চিকিত্সা নিতে আনে না। তারা মনে করে, হাসপাতালে যাওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। আবার অনেকে রোগটির কথা বিশ্বাসই করে না। যারা চিকিত্সা দেন তাদেরকেও সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একজন নার্স জানিয়েছেন, এবোলা রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করার কারণে সম্প্রতি তার স্বামী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
