সাগরে বড়সড় কোন জাহাজডুবির কথা বলা হলেই বেশির ভাগ মানুষের মনেই ঘুরে ফিরে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ১৯১২ সালের ১৪ই এপ্রিলে ঘটে যাওয়া সেই টাইটানিক ট্র্যাজেডির কথাই চলে আসে। কারণ ধনাঢ্য সব যাত্রীবোঝাই সেই জাহাজডুবির ঘটনা সারাবিশ্বে প্রচার পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। মোট ১৫১৪ জন হতভাগ্য যাত্রী ও ক্রুর মৃত্যু ঘটেছিল আরএমএস টাইটানিক নামক জাহাজডুবির সেই ঘটনায়। বেঁচে গিয়েছিল মাত্র ৭১০ জন। কিন্তু প্রাণহানির দিক দিয়ে টাইটানিককেও ছাড়িয়ে গেছে আরও বেশ কয়েকটি জাহাজডুবির ঘটনা। তেমন কিছু ভয়াবহ ঘটনার কথাই তুলে ধরবো আজ—
০০০০০০০০০০০০
জার্মান জাহাজ ডুবে ৯৪০০ জনের মৃত্যু
১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিককার ঘটনা। প্রবল পরাক্রমশালী জার্মান বাহিনীর তখন ভগ্নদশা। পূর্ব প্রুশিয়ায় জার্মানদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল দুর্ধর্ষ রেড আর্মি। জীবন বাঁচাতে বাল্টিক সাগর দিয়ে বিশাল এক জাহাজে করে পালাবার চেষ্টা করছিল হাজার দশেক জার্মান সামরিক, বেসামরিক নাগরিক ও নাজি কর্মকর্তা। কিন্তু হায়! পর পর তিনটি টর্পেডো এসে আঘাত হানে এম ভি গুসলভ নামক ঐ জার্মান জাহাজটিতে। মাত্র পৌনে এক ঘন্টার মধ্যেই সাগরে পুরোপুরি ডুবে যায় জাহাজটি। মারা যান ৯ হাজার ৪শ’ মানুষ। সেই সঙ্গে সাগরে জাহাজডুবিতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০
টর্পেডোর আঘাতে ৭ মিনিটে পানিতে নিমজ্জিত, মৃত ৬ হাজার
এটাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকের ঘটনা। ৬ হাজার ১শ’ জন আরোহী নিয়ে এমভি গোয়া নামক জার্মানির একটি পণ্যবাহী জাহাজ বাল্টিক সাগরপথে যাচ্ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। যাত্রীদের অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু। হঠাত্ শত্রুপক্ষের একটি টর্পেডো এসে আঘাত হানলে মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যেই জাহাজটি ডুবে যায়। পানিতে ডুবে এবং ঠান্ডায় জমে মারা যায় প্রায় সব যাত্রী। প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয় মাত্র ১৮৩ জন। ১৯৪৫ সালের ১৬ই এপ্রিল সংঘটিত সাগরে জাহাজডুবিতে এটাই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা।
০০০০০০০০০০০০০০০০
ব্রিটিশ জাহাজ ডুবে ৪ সহস্রাধিক মৃত্যু
১৯৪০ সালের ১৭ জুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সাগরে ডুবে যায় ব্রিটিশ জাহাজ আরএমএস ল্যাঙ্কাস্ট্রিয়া। ঝরে যায় ৪ সহস্রাধিক মূল্যবান প্রাণ। এটাই কোনো ব্রিটিশ জাহাজডুবিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা।
০০০০০০০০০০০০০০০০০০
জার্মান টর্পেডোর আঘাতে ব্রিটিশ জাহাজ ডুবে সহস্রাধিক মৃত্যু
১৯১৫ সালের ৭ মে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন। ইংল্যান্ডের লিভারপুল থেকে ১৯৫৯ জন যাত্রী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক যাচ্ছিল আরএমএস লুসিতানিয়া নামক ব্রিটিশ জাহাজ। হঠাত্ এক জার্মান টর্পেডো এসে আঘাত হানে জাহাজটিতে। মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যেই ডুবে যায় সেটি। মারা যান ১ হাজার ১৯৮ জন যাত্রী। এই ঘটনা জার্মানীর বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়তে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।
০০০০০০০০০০০০০০০০০
ফিলিপিনো ফেরি ডুবে ৪,৩৭৫ জনের মৃত্যু
১৯৮৭ সালের ২০ ডিসেম্বর ফিলিপাইনের যাত্রীবাহী ফেরি দোনা পাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগে এমটি ভেকটর নামক এক জাহাজের। শুধু সংঘর্ষ হলে হয়তো তেমন কিছু হতো না। দুর্ভাগ্যক্রমে জাহাজটি ছিল জ্বালানিবাহী। ৮ হাজার ৮০০ ব্যারেল জ্বালানিতে ঠাসা ছিল জাহাজটি। ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানিতে আগুন ধরে যায় এবং পুরো ফেরিতে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাগরে ডুবে যায় ফেরিটি। সংঘর্ষের সময় ফেরির অধিকাংশ যাত্রীই ছিলেন ঘুমিয়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন্ত দগ্ধ হয়ে ও সাগরে ডুবে মারা যান ফেরির ৪ হাজার ৩৭৫ জন যাত্রী।
— আশেক খান আলেখীন
