গত ২৪ ঘন্টায় নদ-নদীর পানি বেড়ে বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পূর্ণিমার জোয়ারে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পানিবন্দি মানুষ। এদিকে পানির তোড়ে আমতলীতে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার মোরেলগঞ্জ ও মংলা পৌরসভার নিম্নাঞ্চলসহ কমপক্ষে ৩০ গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। গ্রামের পানিবন্দি পরিবারের সদস্যদের পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়। অনেকের কাঁচা ঘর-বাড়ি ধসে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মোরেলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের অধিকাংশ অফিসের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা সদরের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় শামীম আহম্মেদ জানান, পানগুছি নদীর তীরে পৌর এলাকায় বেড়িবাঁধ না থাকায় পৌর এলাকায় হু হু করে পানি ঢুকে পড়েছে।
পানিবন্দি গ্রামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মোরেলগঞ্জের কুমারখালী, সন্ন্যাসী, খাউলিয়া, গাবতলা, কাঁঠালতলা, পাঠামারা, বদনীভাঙ্গা, সানকিভাঙ্গা, বড়বাদুরা, বারইখালী, শ্রেণীখালী, শোনাখালী, পঞ্চকরণ, ঘসিয়াখালী, বহরবুনিয়া ও ফুলহাতা। স্থানীয়রা দ্রুত এসব এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, পায়রা নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে নদী তীরবর্তী ১৯টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জোয়ারের তোড়ে বালিয়াতলী ও তালতলীর তেঁতুলবাড়িয়া বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে আরো ৪টি গ্রাম তলিয়ে যায়। ফলে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ঐসব এলাকার প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দা। এদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পায়রা নদীর ফেরির গ্যাংওয়ে তলিয়ে গেছে। এতে ৪ ঘন্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সকালে বালিয়াতলীর বেড়িবাঁধের ২৫ ফুট ধসে ঐ এলাকার পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলী ও ঘোপখালী তলিয়ে যায়। শনিবার রাতে তেঁতুলবাড়িয়া বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানি ঢুকে ঐ এলাকা প্লাবিত হলে প্রায় ৪শ’ বিঘা ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এছাড়া জোয়ারের পানিতে নদী তীরবর্তী খোট্টার চর, জয়ালভাঙ্গা, চরপাড়া, গাবতলী, নলবুনিয়া, নিন্দ্রার চর, আশার চর, ছোট আমখোলা, নিশানবাড়িয়া, চরপাড়া গুচ্ছগ্রাম, ঘোপখালী, লোছা, আমতলী ফেরিঘাট, পুরান বাজার, আঙ্গুলকাটা, গুলিশাখালী, হরিদ্রা বাড়িয়া প্রভৃতি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বরগুনার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী গাজী নূর মহম্মদ জানান, পায়রা নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বিপদ সীমার দুই থেকে আড়াই ফুট উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় আমতলী ও তালতলীর অনেক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সিডরের পর ঐ এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সঠিকভাবে পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় ভাঙ্গনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পিরোজপুর অফিস জানায়, পূর্ণিমার জোতে বঙ্গোপসাগরে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদী-খালের দুই কূল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষত: চর ও নিন্মাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে ঘর-বাড়ি, ফসলের ক্ষেত, পানের বরজ, বাগান ও মাছের ঘের ও জেলা শহরের নিন্মাঞ্চলের রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, কচা ও সন্ধ্যা নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় রবিবার কাউখালী উপজেলার নদী তীরবর্তী ৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। প্লাবিত গ্রামগুলো হল— আমরাজুড়ি, আশোয়া, জব্দকাঠী, কুমিয়ান, সোনাকুর, রঘুনাথপুর, ধাবরী, মেঘপাল, বেকুটিয়া, সুবিদপুর, নিলতী, পাঙ্গাসিয়া, জোলাগাতী, শিয়ালকাঠী, চিরাপাড়া, বিড়ালজুরি, আসপদ্দি, জয়কুল, বৌলকান্দা প্রভৃতি। ফলে জেলার খেটে খাওয়া মানুষগুলো চরম বিপাকে পড়েছেন। উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বেকুটিয়া ও আমরাজুরি গ্যাংওয়ে তলিয়ে থাকায় ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, শনিবার উপজেলার পূর্বাঞ্চলের মাদ্রাজ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর, হামিদপুর, চর নিউটন, চর আফজাল, পূর্বমাদ্রাজ, মিয়াজানপুর, আসলামপুর ইউনিয়নের আয়েশাবাগ ও আসলামপুর, জাহানপুর ইউনিয়নের ওমরাবাজ ও জাহানপুর এবং হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব হাজারীগঞ্জ এবং হাজারীগঞ্জ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রবিবার সরেজমিনে চরমাদ্রাজ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখনো পানির নীচে ডুবে আছে বহু মাছের খামার, শস্যের খামার ও বসত ভিটা। সে াতের টানে ভেঙ্গে গেছে পাকা রাস্তা। এসব এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে আছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আকন গতকাল হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
প্লাবিত এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ভেঙ্গে যাওয়া বেড়িবাঁধ যথাসময়ে নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে শত শত মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
বানারীপাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, জোয়ারে সন্ধ্যা ও এর শাখা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বানারীপাড়া পৌর এলাকাসহ উপজেলার ৮ ইউনিয়নের কয়েকশ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চকরিয়ায় বাঁধ ভেঙ্গে ভেসে গেছে
দুই কোটি টাকার চিংড়ি!
চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, রবিবার সকালে সামুদ্রিক জোয়ারের প্রবল চাপে প্রায় চারশ’ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে গেছে উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের চিলখালী এলাকার ৫০-৬০টি চিংড়ি ঘের। এতে প্রায় দুই কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় চিংড়ি প্রকল্প মালিকরা।
বদরখালী ইউপি চেয়ারম্যান নুরে হোছাইন আরিফ বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে সামুদ্রিক জোয়ারের পানিতে চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম শফিকুল হক বলেন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় চকরিয়া উপকূলের বেড়িবাঁধসমূহে সংস্কার কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভেঙ্গে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে প্রয়োজনীয় অর্থ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আবেদন করা হবে।
