সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় কারাগারে আটক এক আসামির পক্ষে হেবিয়াস কর্পাস রিট পিটিশন দায়ের করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। আবেদনে তিনি আসামি তানভীর রহমানের জামিনে মুক্তির আবেদন করেছেন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম তিনি কারো পক্ষে উচ্চ আদালতে হেবিয়াস কর্পাস রিট পিটিশন দায়ের করলেন। এ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। হেবিয়াস কর্পাস পিটিশনটি আদালত শুনানি না করে এক সপ্তাহের জন্য মুলতবি করে দিয়েছেন। আদালত মিজানুর রহমানের আইনজীবীকে পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্টের ফৌজদারি মোশন বেঞ্চে নিম্ন আদালতের জামিন খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করতে। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের ডিভিশন বেঞ্চে গতকাল আবেদনটি শুনানির জন্য উত্থাপন করলে আদালত এ আদেশ দেয়। আবেদনকারীর আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ আবেদনটি আদালতে শুনানির জন্য উত্থাপন করেন।
পরে ফাওজিয়া করিম ফিরোজ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আবেদনে বলেছি, তানভীরের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। এজাহারে তার নাম নেই। রিমান্ডে নেয়ার পরও তার কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপরও তিনি জামিন পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, বিচারিক আদালত গত ২৬ জুন আমাদের জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে এখন হাইকোর্টের জামিনের বেঞ্চে আবেদন করব। জামিন না পেলে সেই আদেশের অনুলিপি নিয়ে এই আদালতে আসব। তিনি বলেন, শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু তদন্তের নামে বিনা বিচারে নির্দোষ কাউকে আটক রাখা হোক এটা চাই না।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এ ঘটনায় ওই বছরের অক্টোবর মাসে তানভীরকে আটক করা হয়। আটকের পর তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়। পরবর্তীকালে তানভীরকে এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তিনি নিহত সাংবাদিক দম্পতির বন্ধু ছিলেন। তানভীর বর্তমানে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে আছেন। আটকের পর তানভীর বিচারিক আদালতে জামিনের আবেদন করেন। ওই আবেদন খারিজ হলে তিনি হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ২০১৩ সালের ২ জুন হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ জামিন আবেদনটি ‘উপস্থাপিত হয়নি’ মর্মে খারিজ করে দেয়। গত এপ্রিল মাসে তানভীর পুনরায় হাইকোর্টে জামিন চান। ওই আবেদনও খারিজ করে দেয় আদালত।
এরপর তানভীরের পিতা মাহবুবুর রহমান ‘বিনা-বিচারে’ ছেলেকে আটকে রাখার অভিযোগ করে গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেন। সেই আবেদন বিবেচনায় নিয়েই কমিশন ও এর চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান হাইকোর্টে এই হেবিয়াস কর্পাস রিট দায়ের করেন। আবেদনে তানভীরের ‘বেআইনি আটকাদেশ’ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- মর্মে রুল জারির জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি তাকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়নি নিশ্চিত হতে তাকে কেন হাইকোর্টে হাজির করা হবে না- তাও জানতে আদেশ চাওয়া হয়। এছাড়া ঘটনায় তানভীরের সম্পৃক্ততার বিবরণ চেয়ে সাত দিনের মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত মহাপরিচালক, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাবের জ্যেষ্ঠ সহকারী মহাপরিচালক, শেরেবাংলা নগর থানার ওসির প্রতি নির্দেশনা চাওয়া হয় রিটে।
উল্লেখ্য হত্যা রহস্যের তথ্য উদঘাটনে ব্যর্থ হওয়ায় হাইকোর্টের আদেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল মামলাটির তদন্তভার ন্যস্ত হয় র্যাবের ওপর। র্যাব তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার পর সন্দেহভাজন ১৬ জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। এছাড়া আলামত হিসাবে জব্দকৃত ছুরি ও পোশাকের নমুনাও পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও খুনি সনাক্ত করা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের এক বছর আট মাস পর ঘটনায় ‘জড়িত’ আটজনকে চিহ্নিত করে সাতজনকে গ্রেফতারের কথা জানান তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। এর মধ্যে ৫ জন ডা. নারায়ণ চন্দ দত্ত নিতাই হত্যা মামলার আসামি।
