সালাম মুর্শেদির কলাম

রড্রিগেজ টুর্নামেন্টের সেরা আবিষ্কার

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৪
এক মাসের পথ পরিক্রমা শেষে গতকাল রাতেই পর্দা নেমে গেছে ব্রাজিল বিশ্বকাপের। একই সঙ্গে শুরু হয়ে গেছে রাশিয়া বিশ্বকাপের ক্ষণ গণনাও। তবে বরাবরের মতোই বিশ্বকাপের এবারের আসরটিও তৈরি করেছে কিছু নতুন ঘটনা, নতুন ইতিহাস। একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে কিছু নতুন তারকাও। আমি নিশ্চিত আরেকটি বিশ্বকাপ আসার আগ পর্যন্ত তারাই জাতীয় দল এবং ক্লাবের জার্সি গায়ে মাঠ মাতিয়ে রাখবেন। তাদের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হবেন ফুটবলপ্রেমীরা। আর এই বিশ্বকাপের সেরা আবিষ্কার হিসাবে আমি বলবো কলম্বিয়ার হেমাস রড্রিগেজের কথা। যদিও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আরো অনেকেই ভাস্বর করে রেখেছেন বিশ্বকাপের সদ্য সমাপ্ত আসরটি। পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গেছেন কারা আগামী চার বছরের জন্য বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছেন। নিশ্চিত হয়ে গেছেন গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল কারা পাচ্ছেন সেটাও। আমি যখন এই লেখা লিখছি তখনও জানি না শেষ পর্যন্ত কারা তাদের সাফল্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। যেহেতু সবার পক্ষে সর্বোচ্চ গোলদাতা কিংবা সেরা খেলোয়াড় হওয়া সম্ভব নয়, নিশ্চিতভাবেই বাদ পড়ে গেছেন সম্ভাবনাময় বেশ কিছু খেলোয়াড়। তবে আমি নিশ্চিত দর্শক হূদয় থেকে এত তাড়াতাড়ি ঝরে পড়ছেন না তারা। বিশ্বকাপের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হচ্ছে, নতুন কিছু সুপারস্টার জন্ম দেয়া। শুধু বিশ্বকাপ নয়, প্রায় প্রতিটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টই আসলে নতুন কিছু তারকার জন্ম দেয়। যেমন গত বছরের কনফেডারেশন্স কাপের বড় সাফল্যই কিন্তু নেইমারকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা এবং তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছে। আপনি যদি গত বিশ্বকাপের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন লুইস সুয়ারেজের হঠাত্ করে পাওয়া তারকাখ্যাতির কারণও কিন্তু ছিল একই। বিশেষ করে ঘানার বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে হাত দিয়ে নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেয়ার সেই দৃশ্য তো ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেছে। অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই বিশ্বকাপও জন্ম দেবে নতুন কিছু তারকার। আমার চোখে তাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রড্রিগেজ। প্রায় সাধারণ একটা দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে একাই তুলে এনেছেন এই তরুণ। ছয়টি গোল করার পাশাপাশি সাহায্য করেছেন একাধিক গোল করার ক্ষেত্রেও। এরই মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিখ্যাত ক্লাবের চোখ পড়েছে তার উপর। মাত্র গত বছরই প্রায় সাড়ে চার কোটি ইউরোর বিনিময়ে মোনাকোতে যোগ দেয়া এই তারকা যদি অচিরেই রিয়ালে পাড়ি জমান আমি অবাক হব না। বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকার পাশাপাশি সেরা স্ট্রাইকার হবার দৌড়েও আমি এগিয়ে রাখবো তাকেই। এক্ষেত্রে তিনি অল্প ব্যবধানে পেছনে ফেলবেন জার্মানির টমাস মুলারকে। বায়ার্ন মিউনিখে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায় খেলে গত মৌসুমে বড় সাফল্য না পেলেও দেশের জার্সি গায়ে এই বিশ্বকাপেও সফল এই তারকা। জার্ড মুলারের বিখ্যাত ১৩ নম্বর জার্সি পরা মুলার এরই মধ্যে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যাকে নিয়ে গেছেন দশে। তার সামনে সুযোগ স্বদেশি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার। যদি টুর্নামেন্টের সেরা ডিফেন্ডার বেছে নিতে বলা হয় আমি বেছে নেবো আর্জেন্টিনার হ্যাভিয়ের ম্যাশেরানোকে। দুর্দান্ত একটা টুর্নামেন্ট খেলেছেন এই বার্সেলোনা তারকা। তবে, আসল কথা হচ্ছে আমরা খেলা দেখি গোল দেখার জন্য। যারা গোল করেন কিংবা করান তারাই কেবল আমাদের নজরে থাকেন। আর যারা গোল করতে বাধা দেন তারা তো রীতিমত আমাদের চক্ষুশূল হয়ে যান! ডিফেন্ডারদের ভূমিকাটা অনেকটা থ্যাংকলেস জবের মতো। তবে মাঠে কিন্তু তাদের দায়িত্বটা স্ট্রাইকারদের চাইতে মোটেই কম নয়। মেসি যদি আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ সামলান, তাহলে তাদের রক্ষণ সামলানোর দায়িত্ব থাকে ম্যাশেরানোর উপর। যদিও প্রথাগত ডিফেন্ডারদের চাইতে তার কাজটি কিছুটা আলাদা। ডিফেন্ডার না বলে তাকে হোল্ডিং মিডফিল্ডার বলাই বোধহয় যুক্তিযুক্ত। কারণ, রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণের সাথে যোগাযোগ রক্ষার কাজটিও তাকেই করতে হয়। আর্জেন্টিনা যে, দুই যুগ পর ফাইনালে খেলছে তাতে তার অবদানই আমার মনে হয় সবচেয়ে বেশি। সেরা গোলরক্ষক হিসাবেও আরো অনেকের মতোই আমি বলবো ম্যানুয়েল ন্যুয়েরের কথা। বায়ার্নের হয়ে নিজের অবিশ্বাস্য ফর্মটা জাতীয় দলেও টেনে এনেছেন তিনি। পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আমার চোখে লেগেছে ন্যুয়েরের মানসিকতাও। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে সাত গোল দেয়ার পরেও জার্মানি যখন একটি গোল হজম করলো, তখন ন্যুয়েরের চোখমুখ বলে দিচ্ছিল কতটা হতাশ তিনি! অথচ, সবাই বুঝতে পারছিল এই একটি গোল কোন কাজেই আসবে না। এই গুণটি একজনকে অন্য সবার চাইতে আলাদা করে দিতে পারে। আমার বিশ্বাস, অলিভার কানের পর স্মরনকালে ন্যুয়েরই জার্মানির সেরা গোলরক্ষক। এবার আসা যাক টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় প্রসঙ্গে। লিওনেল মেসি, আরিয়েন রোবেন, নেইমার। এই তিনজনই ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। মেসি আর্জেন্টিনা দলের প্রাণ, রোবেন যেমন নেদারল্যান্ডসের। তবে এই দুজন নন, আমার চোখে সেরা নেইমার। কারণ, একজন খেলোয়াড়কে যদি সেরা খেলোয়াড় হিসাবে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে তার মধ্যে এমন কিছু গুণ থাকতে হবে যেটা তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে দেবে। বিশ্বসুন্দরী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেমন সৌন্দর্য বিবেচ্য নয়, তেমনি কেবল মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে আমি সেরা বিচার করতে রাজি নই। নেইমার মাঠ এবং মাঠের বাইরে নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন এই বিশ্বকাপে, কোয়ার্টার ফাইনালের পর ব্রাজিলের পারফরম্যান্স বুঝিয়ে দিয়েছে দলে নেইমারের প্রভাব কতটা। তাছাড়া উঠতি খেলোয়াড়দের জন্য তিনি একজন আদর্শে পরিণত হয়েছেন। সব মিলে আমি বলবো, ব্রাজিল লজ্জাজনকভাবে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও নেইমারের জন্য অসাধারণ একটা বিশ্বকাপ ছিল এটা।