অবসর প্রাপ্ত পোস্ট মাস্টার আব্দুল হক মজনু মিয়া (৭০) ও তার স্ত্রী অবসর প্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রায়হানুন্নেছা (৬৩)। দু’ছেলের জনক-জননী। দু’ছেলের চাকরি সুবাদে ঢাকায় বসবাস। আর অবসর জীবনে অলস সময় কাটান নিজ বাড়িতে। এক সময় ভাড়াটিয়ার ভাই বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র মিঠুর ব্যবহারে মুগ্ধ হন তারা। স্থান দেন সন্তানের আসনে। আর সবাইকে প্রাণ খুলে জানিয়ে দেন, মিঠু তাদের ধর্মপুত্র। সেই ধর্মপুত্রের হাতে নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন দু’জনে। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার রাতে ময়মনসিংহ শহরের আকুয়ায় গরুর খোয়াড় এলাকায়। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালাবার সময় এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ে ঘাতক ধর্মপুত্র গোলাম মোস্তফা মিঠু। এলাকাবাসী তাকে গণপিটুনি দিয়ে থানায় সোপর্দ করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মিঠু হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। নিহত এই দম্পতি তাদের তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। অন্য দুটি তলা ভাড়া দেওয়া।
প্রতিবেশীরা জানান, মিঠুর বোন একসময় ভাড়া থাকতো আব্দুল হক মিয়ার বাসায়। এ সময় তাদের সঙ্গে মিঠুর খুব সখ্যতা গড়ে ওঠে। খুন হওয়া দম্পত্তি মিঠুকে ধর্ম ছেলে হিসেবে খুব আদর করতেন। সে সুবাদে বোন চলে গেলেও মিঠুর ঐ বাসায় আসা-যাওয়া ছিল। চাকরি ও ব্যবসায়িক কারণে নিহতদের দুই ছেলে রানা ও রাসেল ঢাকায় বসবাস করেন। রানা ভূমিপ্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম হিরার মেয়ের জামাতা। নিহতদের গ্রামে বাড়ি গফরগাঁও উপজেলার সদরের ধামাইল গ্রামে। চলতি বছর নিহত দম্পতি হজ্বে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত রবিবার বাদ আসর জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।
ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পরিদর্শক মাজেদুর রহমান জানান, গোলাম মোস্তফা মিঠুর গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কোর্টচাঁদপুর উপজেলার ছয়খাদায়। তার পিতা ইউপি সদস্য আবু জাফর। মিঠু বর্তমানে ময়মনসিংহের বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রুমডো ইন্সটিটিউটের পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্র।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিঠু হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, তার পিতার দেয়া সেমিস্টারের টাকা সে খরচ করে ফেলে। এ অবস্থায় মিঠু নিহত দম্পতির কাছে ল্যাপটপ বন্ধক দিয়ে হলেও টাকা ধার চায়। কিন্তু তারা টাকা দিতে অস্বীকার করেন। এ কারণে সে হত্যার পরিকল্পনা করে। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী শনিবার রাতে ছুরি, চাপাতি, হাতুড়ি নিয়ে (ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে) ওই বাসায় যায়। বিভিন্ন কথাবার্তার এক পর্যায় আবার টাকার প্রসঙ্গ তোলে। টাকা না দেয়ার অবস্থানে অনঢ় থাকায় মিঠু তাদের কুপিয়ে হত্যা করে।
প্রতিবেশীরা আরও জানায়, ওই বাসায় রাত এগারটার দিকে চিত্কারের শব্দ শুনে লোকজন এগিয়ে গেলে দুই তলা থেকে মিঠু লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। স্থানীয় লোকজন মিঠুকে আটক করে এবং গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে পুলিশ স্বামী-স্ত্রী দুইজনকেই রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু মোহাম্মদ ফজলুল করিম জানান, গত রবিবার ময়না তদন্ত শেষে নিহতদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কতোয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ আলামত হিসেবে উদ্ধার করে ছুরি, চাপাতি, হাতুড়ি ও একটি শার্ট।
