জার্মানদের যেন এখন আনন্দের সীমা-পরিসীমা নেই। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ২৪ বছর পর এবং চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে জার্মান জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা দেশবাসীকে আনন্দে মাতোয়ারা করে তুলেছে। সমগ্র জার্মানি ভাসছে আনন্দের বন্যায়| এ আনন্দের ঢেউ লেগেছে মহাশূন্যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কর্মরত জার্মান নভোচারী আলেকজান্ডার জাস্টের মনেও। তিনি সেখানে জার্মানির একটি জার্সিতে আগের তিনটি তারার সাথে চতুর্থ একটি যোগ করে নিয়ে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
বাংলাদেশে জার্মান ভক্ত হিসেবে ব্যাপক আলোচিত মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেনও আনন্দে অবগাহন করছেন। তিনি জানিয়েছেন- এ জয়ের পর গ্রুমে মেজবান আয়োজন করে ৫০০ লোককে ভূরিভোজ করাবেন। জার্মান দলের বিশ্বকাপ জয়ের পর আমজাদ হোসেনের গ্রামবাসীরা তাকে নিয়ে আনন্দ মিছিল করেন। তাকে কোলে তুলে নিয়ে আনন্দ করে গ্রামবাসীরা। প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার লম্বা জার্মান পতাকা তৈরি করে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেন এই কৃষক। তাকে ইতোমধ্যেই জার্মান জাতীয় দলের ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ দিয়েছে বাংলাদেশের জার্মান দূতাবাস।
বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও আর্জেন্টিনার শহরগুলোতেও সমর্থকদের আনন্দের খবর মিলেছে। তবে তাদের আনন্দ খানিকটা ম্লান করে দিয়েছে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ৭০ জন?
কোচ জোয়াকিম লোর অধীনে জার্মান দল গত রবিবারের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে দেয়া মারিও গোটজের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ তুলে নেয়। এরপর থেকে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা যেমন আনন্দ উদযাপনে কোন সময় নষ্ট করেননি, তেমনি উত্সবে মাতোয়ারা হয়েছেন সাধারণ জার্মানরাও।
জার্মান রেডিও ডয়েচে ভেলে জানায়, জার্মানিতে গভীর রাতেই শুরু হয়ে যায় অধিনায়ক ফিলিপ লামের দলের বিশ্বকাপ জয় উদযাপন। রাস্তায় নামে উল্লসিত জনতার ঢল। সবার মুখে ছিল- ‘ডয়েচলান্ড, ভেল্ট মাইস্টার’, অর্থাত্ ‘জার্মানি, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ শ্লোগান। এ সময় দলের তারকা খেলোয়াড়দের নামেও শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নীচে ১২০ মিনিটের টানটান উত্তেজনার ম্যাচ উপভোগ করা অনেক জার্মান সমর্থককে গাড়ির হর্ন বাজিয়েও আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেছে?
গোটসের ১১৩ মিনিটে করা এক অসাধারণ গোলের সুবাদেই প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকায় আয়োজিত কোনো বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলো জার্মানি? কোচ লো ও তার খেলোয়াড়রা ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে খেলাটি শেষ হওয়ার পর পরই ট্রফি নিয়ে উত্সব করতে থাকেন। হোটেলে ফিরে সেখানে আয়োজিত পার্টিতে যোগ দেন খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও বান্ধবীরাও।
জার্মান চ্যাঞ্চেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও সেদেশের প্রেসিডেন্ট জোয়াকিম গাউক খেলা শেষ হওয়ার পর আয়োজিত পার্টিতে যোগ দেন। জানা গেছে দলটি দেশে ফিরে এলে বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনের রাস্তায় আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্সব হবে। ২০১৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নদের আজ মঙ্গলবার ব্রাজিল থেকে জার্মানিতে ফেরার কথা রয়েছে।
এদিকে লিওনেল মেসির দল ফাইনালে হেরে গেলেও আর্জেন্টিনার সাধারণ ফুটবল সমর্থকরা তাতে খুশি। ১৯৯০ সালের পর প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়াকে সম্মানেরই মনে করছেন তারা। তাই মারাকানার ফাইনাল শেষে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস আইরেসে প্লাজা স্যান মার্টিনে বড় পর্দায় খেলা দেখা হাজার পঞ্চাশেক মানুষ পরাজয়ের হতাশায় ভেঙ্গে না পড়ে বরং উদ্দাম আনন্দেই মেতে ওঠেন।
সবার কণ্ঠে শোনা যায় মেসি ও তার দলের প্রশংসা। রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের যে জায়গাটায় জাতীয় পর্যায়ের সব আনন্দ উদযাপন করেন আর্জেন্টাইনরা, সেই ওবেলিস্কেও দেখা গেছে একই দৃশ্য। অবশ্য এ আনন্দ মাটি করে দেয় আর্জেন্টিনার একদল উগ্র সমর্থক। গভীর রাতে তাদের আক্রমণের শিকার হয় পুলিশ। পুলিশের দিকে ঢিল ছুঁড়তে থাকলে শুরু হয় যায় সংঘর্ষ। এ সময় শিশু সন্তান কোলে নিয়ে অনেক মা-বাবাকেই দিশেহারা হয়ে ছুটতে দেখা গেছে। উচ্ছৃঙ্খল কিছু লোক তখন দোকানপাট লুটপাটে লিপ্ত হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেট ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সংঘর্ষে ৭০ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে ১৫ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।
