ফুটবল উন্মাদনায় কাটলো একটি মাস

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৯
পৃথিবীর ‘গ্রেটেস্ট শো’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপের আনন্দ-উল্লাস, হাসি-কান্নার ঢেউ বরাবরই হাজারো মাইল দূরে বাংলাদেশে আঁছড়ে পড়ে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। পরশু রাতে ফাইনাল খেলায় জার্মানির আনন্দের ছোঁয়া যেমন লেগেছে দেশের অলিগলিতে, তেমনি বিশ্বকাপ না জেতায় হিগুয়েন-ডি মারিয়ার কষ্টটাও ছুঁয়ে গেছে দেশের আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মাঝে। মেসির নিস্তব্ধতা ও শোকে পাথর হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে মন খারাপ করেননি এমন মানুষ খুব কমই দেখা গেছে। ফুটবল বিশ্বকাপে নেই বাংলাদেশ। তাতে কি? এই একটি মাস দেশের মানুষের পোশাক-আশাকে, আলাপ-আলোচনায়, ঘুমে-জাগরণে ছিল ফুটবল। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রগুলোতে এ সংক্রান্ত ছিল নানা খবর। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তরে আলোচনার ঝড় বুঝতেই দেয়নি যে বাংলাদেশ খেলছে না। বরং নানা দলের সমর্থকদের সম্মিলন, পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় মনে হচ্ছিল বাংলাদেশই যেন পরিণত হয়েছে বিশ্বকাপের আরেক আয়োজক দেশে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে প্রিয় দলের সমর্থকদের অম্ল-মধুর ঝগড়াও ভিন্নমাত্রা দেয় আনন্দে। বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ছোয়া মানুষের বিনোদনকে কয়েকগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে বড় পর্দায় খেলা দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে জড়ো হতে দেখা গেছে ফুটবলপ্রেমীদের। ঘরে-বাইরে ও বন্ধু-পরিবার নিয়ে একত্রে ফাইনালের জার্মানি-আর্জেন্টিনার ম্যাচটি দেখেছেন সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত রেফারির শেষ বাঁশিতে শেষ হাসি হেসেছে জার্মানি এবং তাদের বাংলাদেশি সমর্থকরা। জার্মানির জয়ের পর আতশবাজির শব্দ শুনতে পাননি এমন একজন রাজধানীবাসী খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন হবে। আনন্দ মিছিল হয়েছে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে। পুরান ঢাকা এলাকা থেকে শুরু করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কূটনৈতিক পাড়া খ্যাত গুলশান-বারিধারায়ও দেখা গেছে মানুষের উল্লাস। তবে তরুণ সমর্থকের উল্লাস যেন বেশিই ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, আমি খেলা বুঝতে শেখার পর থেকে জার্মানির একনিষ্ঠ সমর্থক। কারণ তাদের ‘পাওয়ার ফুটবল’। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের পর আক্রমণ করে তারা। এবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই দাপটই দেখিয়েছে জার্মানি। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ফুটবল প্রেমিকদের পছন্দের দল অবশ্য আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের হতাশাজনক বিদায়ের পর ফুটবলের উত্তেজনা ঘিরে ছিলো আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মাঝে। জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে অনেকটাই অনিশ্চয়তা কাজ করছিলো। জার্মানির শেষ হাসিতে কেঁদেছে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। জান্নাত মীম নামে এক আর্জেন্টাইন সমর্থক খেলা দেখতে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। খেলা দেখে রীতিমতো হতাশ তিনি। মেসি, হিগুয়েনের একের পর এক সুযোগ নষ্টকেই হারার কারণ মনে করেন তিনি। তবে খেলা দেখে তিনি অখুশি নন। অপর এক সমর্থক চোখ মুছতে মুছতে বললেন, মেসির জন্য কাপটা জরুরি ছিলো। তার মতো একজন খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ না জেতাটা অনেক বড় কষ্টের। বরিশালে খেলা দেখা নিয়ে সংঘর্ষে আহত ২০ বরিশাল অফিস জানায়, বাবুগঞ্জের রহমতপুরে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা দেখাকে কেন্দ করে রবিবার রাতে বাংলাদেশ কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ২০ জন আহত হয়েছে। এসময় একাডেমিক ভবনসহ বেশ কয়েকটি ভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুরের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে থাকা একটি বাস ভাংচুর করা হয়েছে। খবর পেয়ে বিমানবন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। গুরুতর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ওসমান খান বলেন, ঘটনার সময় তিনি প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না। এ ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। বিমান বন্দর থানার ওসি মো. শাহেদুজ্জামান বলেন, খবর পেয়ে তাত্ক্ষণিক পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার পূর্বেই বহিরাগতরা পালিয়ে যায় বলে ওসি জানান। লোহাগাড়ায় আর্জেন্টিনা সমর্থকের মৃত্যু সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় মো. রুবেল(১৮) নামে এক আর্জেন্টিনার সমর্থক মারা গেছেন। তিনি উপজেলার বড়হাতিয়া হরিদাঘোনা এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে। মাগুরায় জার্মাানির পক্ষে আনন্দ মিছিল মাগুরা প্রতিনিধি জানান, বিশ্বকাপ ফুটবল বিজয়ের আনন্দে গতকাল সোমবার দুপুরে মাগুরায় আনন্দ মিছিল বের করে জার্মানির সমর্থকরা । জার্মানির পতাকা নিয়ে ট্রাক মিছিল বের করা হয় শহরে। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে । এদিকে ৩ কিলোমিটার লম্বা জার্মানির পাতাকা তৈরিকারী মাগুরার ঘোড়ামারা গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন মোল্লা জানিয়েছেন, তিনি এক সপ্তাহ পর জার্মানির বিশ্বকাপ ফুটবল জয় উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান করবেন। চোখের জলে ভেসে গেছে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাস রংপুর প্রতিনিধি জানান, বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হারে চোখের জলে ভেসে গেছে রংপুরের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আনন্দ-উল্লাস। খেলার ফল নিশ্চিত হওয়ার পর নিস্তব্ধতা নেমে আসে সমর্থকদের মাঝে। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সমবেদনা জানাতে দেখা গেছে ব্রাজিল সমর্থকদের। গরু-খাসি জবাই করে ভূরিভোজের আয়োজন করা হলেও আর্জেন্টিনার পরাজয়ের ফলে সেহেরি না খেয়েই রোজা রেখেছেন অনেকেই। খেলা শেষে বাদ্যযন্ত্র ও গরুর গাড়ি নিয়ে নগরীতে মিছিলের প্রস্তুতি নেয়া হলেও তা করা হয়নি। ফাইনাল খেলা উপলক্ষে রংপুরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় টাঙ্গানো হয় বড় পর্দা। সকাল থেকেই রংপুর নগরীর প্রতিটি পয়েন্টে পয়েন্টে বাজানো হয় ঢাক-ঢোল। ইফতারের পর থেকে শুরু হয় আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর ধুম। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কেউ কেউ মাথা ন্যাড়া করে আর্জেন্টিনার পতাকা, হাতে ও গালে স্টিকার লাগিয়ে নগরী ঘুরে বেড়ায়। হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, আর্জেন্টিনার পরাজয়ে উপজেলার হাজার হাজার সমর্থক কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। খেলার সময় যে উল্লাসটা ছিল, জার্মাানির গোলের পর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় হতাশা। শুরু হয় পতাকা নামানোর হিড়িক। ফুটবল প্রেমিক নজরুল ইসলাম জানান, আর্জেন্টিনার পরাজয় হূদয়ে শেলের আঘাত হেনেছে।