বর্ষায় জেগে ওঠে পাড়া

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪৪
প্রাকৃতির সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর গতিময় ছন্দে আন্দোলিত এক অপূর্ব বৈচিত্র্যের দেশ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত্, হেমন্ত, শীত, বসন্ত প্রকৃতির পরিক্রমায় ফিরে ফিরে আসে ঋতুগুলো বাঙালি জীবনে। এক এক ঋতুতে প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সাজে। আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দু’মাস বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের খরতাপে যখন সমগ্র বাংলাদেশ তৃষিত, শূন্য খাল-বিল ও শীর্ণ নদী, তখনই বাংলার দিনপঞ্জিতে আসে অবিশ্রান্ত বর্ষণে পরিপূর্ণতা বর্ষাকাল। বাংলাদেশের ঋতু প্রকৃতিতে বর্ষার প্রভাব সীমাহীন। এ সময় প্রচুর বর্ষণের ফলে নামে ঢল। গলা জলে দাঁড়িয়ে থাকে সবুজ ধানগাছ। নৌকা বেয়ে গান গেয়ে যায় গাঁয়ের মাঝি। আকাশে মেঘ গর্জন করতে থাকে। অশান্ত বাতাসে কালো মেঘমালাকে বহন করে উত্তরে ছুটতে থাকে, আকাশে মেঘ ও বিদ্যুতের খেলা শুরু হয়। বান ডাকে নদীতে। বর্ষায় বনে বনে ফোটে বাহারী জংলা ফুল। কদম্বের ডালে ডালে ফোটে রসগোল্লার মতো থোকা থোকা ফুল। ভিজে হাওয়ার মন কাড়া গন্ধ ভেসে ভেসে ভরিয়ে তোলে চারদিক। জুঁই, মালতি, গন্ধরাজ, কেয়া, কুন্দ, কামিনী এমন গন্ধমধূর ছন্দে বর্ষা সাজে। মাঠে মাঠে শাপলা ফুলের মেলা, তার ফাঁকে ফাঁকে হাঁসের স্বচ্ছ সাঁতার। বৃষ্টি ভেজা ময়ূরের নৃত্য। কোথাও কোথাও ব্যাঙের ডাক ঝিঁ ঝিঁর চলন অপূর্ব মনে হয়। গাছে গাছে ডাকে পাখি - বক, সারস, ডাহুকের একটানা ডাক মনকে আনন্দ দেয়। প্রকৃতির কবি রবিঠাকুর বর্ষার প্রাকৃতিক বর্ণনা দিয়েছেন তাই এইভাবে— আষাঢ়ে বাদল নামে নদী ভর ভর মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে ঘোলাজলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে। দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া বরষার উত্সবে জেগে ওঠে পাড়া। আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান দেশ, নদী থেকে বর্ষার স্রোত পলি বয়ে আনে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে কৃষি মাঠে। এতে মাঠ উর্বর হয়, বাংলার মাটি হয়ে ওঠে সোনাফলা সুজলা সুফলা। নদীর পাড় হতে ভেসে আসে কুল কুল ধ্বনি। বর্ষাকালে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নৌকাবাইচ হয়। নৌকায় জারি-সারি গান মানুষকে মুগ্ধ করে। কচুর পাতা চুয়ে চুয়ে ঝরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির ফোঁটা। জল তখন মনে হয় অপরূপ দৃশ্য যেন এক। বর্ষা সৃষ্টির ঋতু তবু বর্ষা মানুষের শস্য নষ্ট করে, বন্যা বানে, নদীবর্তী বা সাগর ঘেঁষা জনপদের মানুষরা আশঙ্কায় দিন পার করে। বর্ষা মানেই আনন্দ ছন্দের দিন ও জলের খেলা মাঠে-ঘাটে। কবিরা বর্ষাকে নানাভাবে উপলব্ধি করেছেন। যুগে-যুগে রচিত হয়েছে হাজারো ছড়া-কবিতা, গান। সেই মধ্যযুগের সাহিত্যচর্চা থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত যত কবি-সাহিত্যিক আছেন, তারা বর্ষা নিয়ে রচনা করেছেন অমর সৃষ্টি। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের, কাজী নজরুল ইসলামের গান কবিতা সর্বজন সমাদৃত। এছাড়া সেই মধ্যযুগের কবি- জ্ঞানদাস, চন্ডীদাস, জসীম উদদীন, জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁরা লিখেছেন বর্ষা নিয়ে। তাঁরা ছোটদের জন্য ছড়া-কবিতা রচনা করেছেন, এঁকেছেন আবেগের ছবি।