একদল ব্যাঙের ছানা মনের সুখে লাফাচ্ছে। লাফাচ্ছে তো লাফাচ্ছেই। এমন সময় একটি কোলা ব্যাঙ কোথা থেকে এসে ওদের জিজ্ঞেস করলো—তোরা অমন করে লাফাচ্ছিস কেন? ছানা ব্যাঙগুলো ছোট ছোট মানবশিশুর মতো উত্তর দেয়—বিত্তি দেখতে আমাদের ভালো লাদে। আম্মু একতা কবিতা তিকিয়েতে। ডিত্তি পলে তাপুর তুপুর, আল পারি না। হেসে উঠল কোলা ব্যাঙ। আকাশের দিকে তাকাল। সত্যিই তো, বৃষ্টিটা তো খুব সুন্দর! এই বলে সেও ছানা ব্যাঙদের সাথে লাফাতে শুরু করলো। বৃষ্টি বাড়ছে। বাড়ছে তো বাড়ছেই।
বড় একটা ভাউয়া ব্যাঙ, ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ শব্দ করতে করতে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। সে চোখ দুটো বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো— সমস্যা কি? তোরা অমন করে লাফাচ্ছিস কেন? কোলা ব্যাঙ, ছানা ব্যাঙদের সাথে আবারও ছোট ছোট বাবুদের মতো উত্তর দেয়— বিত্তি দেখতে আমাদের ভালো লাদে। পিচ্চি বেলার কথা মনে পড়ে গেল ভাউয়া ব্যাঙের। সে চোখ দুটো গোল গোল করে আকাশের দিকে তাকায়। সত্যিই তো, বৃষ্টিটা তো খুব চমত্কার! বলা মাত্রই ঠ্যাঙ তুলে লাফাতে শুরু। অতবড় একটা ব্যাঙ লাফাচ্ছে। তাই দেখে কোলা ব্যাঙ আর ছানা ব্যাঙেরা হেসেই লুটোপুটি। আ আ, ই ই, ও ও । লজ্জা পেয়ে গেল ভাউয়া ব্যাঙ। সে বললো— তোরা অমন করে হাসছিস কেন? আ আ, ই ই, ও ও। হাসছিস কেন অমন করে? কোন উত্তর না পেয়ে ভাউয়া ব্যাঙটাও তার জিভ বের করে হাসতে শুরু করলো। হাসি সংক্রামক ব্যাধির মতো। কারো সামনে যদি কেউ হাসে তাহলে অপরজন কি না হেসে পারে?
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একটা পিচ্চি মেয়ে এসব দৃশ্য দেখছিল। মজাই লাগছে তার। ইচ্ছে করছে বাইরে বের হয়ে সেও বৃষ্টিতে গোসল করে। ব্যাঙদের মতো লাফালাফি করে। কিন্তু ব্যাঙের সর্দি হয় না। মানুষের সর্দি হয়। জ্বর হয়। তাই কড়াভাবে নিষেধ আছে আম্মুর। ভালো লাগে না পিচ্চি মেয়েটার। ঘরের ভিতর বন্দিজীবন। সে মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে চায়। কখনও ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে চায় সবুজ প্রান্তরে। দূরে কোথাও বিকট শব্দে বিদ্যুত্ চমকালো। কোন কোন থেকে একটি কুনো ব্যাঙ কুন কুন করতে করতে ঐ ব্যাঙগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে একটু রাগের স্বরেই বললো— অনেকক্ষণ যাবত্ দেখছি তোরা লাফাচ্ছিস। ঘটনা কি? আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ। কি দারুণ বৃষ্টি! ভাউয়া ব্যাঙটা বললো। ছানা ব্যাঙগুলো পা দোলাতে দোলাতে বলতে লাগলো—বিত্তি দেখতে আমাদের ভাল লাগে। বৃষ্টি দেখতে সবারই ভালো লাগে। কিন্তু ঐ যে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখ, একটা পিচ্চি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখন কি বিপদ ঘটায় কে জানে? তুমি কি সবাইকে একরকম মনে কর নাকি? রাগান্বিত স্বরে বললো ভাউয়া ব্যাঙ। তা মনে করি না। কিন্তু মানুষ মাত্রই বিপদ। কোলা ব্যাঙটা কিছু বললো না। কুনো ব্যাঙের ইচ্ছে ছিল না সে লাফাবে। কিন্তু ব্যাঙদের ধর্মই হচ্ছে লাফানো। হাত-পা নিশপিশ করছে। কতক্ষণ না লাফিয়ে থাকা যায়? তাই সেও ঠ্যাঙ তুলে লাফাতে শুরু করলো। লাফাচ্ছে তো লাফাচ্ছেই।
ব্যাঙদের ঝোঁপের পাশেই একটা ডোবা ছিলো। মোটামুটি শুকিয়ে গিয়েছিল ডোবাটা। বৃষ্টির পানিতে ভরে উঠলো। আর ডোবার মাছগুলো খলবল করে উঠলো। ছোট ছোট পোনা মাছ। একটি পোনা মাছ তার থেকে বড় আরেকটি পোনা মাছকে জিজ্ঞেস করলো— ওরা অমন করে লাফাচ্ছে কেন? সত্যিই তো। ওরা অমন করে লাফাচ্ছে কেন! পোনা মাছটা পাল্টা প্রশ্ন করে। আরেকটা পোনা মাছ বললো— আমরা তো জানতে পারব না। তাহলে কি করা? মাছগুলো নিরুপায় হয়ে ব্যাঙদের লাফানো দেখতে লাগলো। ডোবার ভিতর থেকে ভুস করে ১টি কাঁকড়া উঠলো। সে বললো— অনেকক্ষণ যাবত্ দেখছি তোরা কিচমিচ করে কি যেন আলাপ-আলোচনা করছিস, সমস্যা কি তোদের? কাঁকড়া ভাই, ঐ যে দেখুন ব্যাঙগুলো কি সুন্দর করে লাফাচ্ছে। ওদেরকে দেখে মনে হচ্ছে মনে কত আনন্দ। আপনি গিয়ে একটু জিজ্ঞেস করুন। সত্যিই তো। ব্যাঙগুলো তো খুব সুন্দর করে লাফাচ্ছে! দাঁড়া আমি জেনে আসি। কাঁকড়াটা ডোবা থেকে উঠে ব্যাঙদের কাছে এসে দাঁড়ায়। কি ব্যাঙ ভাইয়েরা, আপনারা অমন করে লাফাচ্ছেন কেন? বিত্তি দেখতে আমাদের ভালো লাগে। বললো ছানা ব্যাঙ। কোলা ব্যাঙ আর ভাউয়া ব্যাঙটা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো— দেখুন কত সুন্দর বৃষ্টি। আসলেই বৃষ্টিটা খুব সুন্দর। আমি অবশ্য লাফাতে পারি। তবে আপনাদের মতো না। এই বলে কাঁকড়াটা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাঙগুলো ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ করে গান ধরলো। কোলা ব্যাঙ, কুনো ব্যাঙ, ভাউয়া ব্যাঙ তা ধিন তা ধিন তা, সাথে ব্যাঙের ছা। তুললো সবাই ঠ্যাঙ, আহা ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। হাততালি দিতে লাগলো পিচ্চি মেয়েটা।
ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি আরো বাড়ল। ব্যাঙগুলো গাইতে গাইতে, লাফাতে লাফাতে ডোবার মধ্যে ঝপ করে পড়ল। মাছগুলো ভয় পেয়ে কিছুটা সরে গেলো একপাশে। কাঁকড়া আশ্বাস দেয়। ভয়ের কোন কারণ নেই। ওরা বৃষ্টি দেখে অমন করে লাফাচ্ছে। এই শুনে মাছগুলো হই-হই করে উঠলো। তারাও লাফানোর চেষ্টা করলো। কাঁকড়া আর কি করে? কিম্ভূতকিমাকার আট পা তুলে সেও লাফাচ্ছে। কোলা ব্যাঙ, কুনো ব্যাঙ, ভাউয়া ব্যাঙ, ব্যাঙের ছানা, মাছের পোনা, কাঁকড়া সবাই মিলে ডোবার মধ্যে এখন লাফাচ্ছে। ওদিক জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনবরত হাততালি দিচ্ছে পিচ্চি মেয়েটা। বৃষ্টি থামল। আকাশে চমত্কার একটা রংধনু উঠল। একদল বৃষ্টিভেজা পাখি কিচির-মিচির করতে করতে ডানা মেলে উড়ে গেল যেন মেঘের কোল ঘেঁষে। ওরা সবাই কি সুন্দর একতাবদ্ধ! মানুষেরা কেন এমন নয়? মানুষেরা কেবল নিজেদের মধ্যে তৈরি করে ভেদাভেদ। আম্মু গান গাইতে চায় দেখে আব্বু আম্মুকে গান গাইতে দেয় না। ঝগড়া করে। ওপরতলার মিনি আন্টি—এরা তার সাথে চেঁচামেঁচি করে। ভিক্ষুক এলে কিছু না দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এসব দেখতে ভাল লাগে না কোন শিশুর। তারা মানুষে মানুষে একতাবদ্ধ একটা সুন্দর পৃথিবী দেখতে চায়। যে পৃথিবীর মানুষেরা অপ্রয়োজনে গাছপালা কাটবে না। পাখি শিকার, পশু হত্যা এবং একে অপরের সঙ্গে হানাহানি করে রক্তপাত ঘটাবে না। তারা মেঘ-পাখি-ফুল, আকাশ-বৃষ্টি সবকিছুকেই ভালবাসবে। তারা ভাববে— পৃথিবীটা যেমন মানুষের, তেমন পৃথিবীতে অবস্থানকারী সৃষ্টিকর্তার সমস্ত সৃষ্টির।
অলঙ্করণ :সোহেল আশরাফ
