১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক করতে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অংশ নিলেন তরুণ, কিশোর, যুবা, আবাল-বৃদ্ধ, বনিতা। কেউ হাতে তুলে নিলেন অস্ত্র। কেউবা সহযোগিতা করলেন অন্যভাবে। মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নিলেন সম্মুখসমরে। আবার তাদের চিকিত্সার্থে অংশ নিলেন অনেক চিকিত্সক, নার্স আর চিকিত্সাকর্মী। মুক্তিযুদ্ধে শুধু পুরুষরাই অংশ নেননি, ছিলেন অনেক নারীরাও। মুক্তিযোদ্ধাদের নারীরা সহযোগিতা করেছেন খাবার তৈরি করে। কেউ সহযোগিতা করেছেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে কাজ করে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন পাকিস্তানি বাহিনীর নানা পরিকল্পনার কথা। আবার কণ্ঠশিল্পীরা মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন গান গেয়ে। তেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ওই সময় বাংলাদেশের এ ফুটবল দলটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নেয়। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে এটি প্রথম কোনো ফুটবল দল, যারা যুদ্ধচলাকালে তহবিল সংগ্রহ ও জনমত গঠন করেছিল।
স্বাধীনতাযুদ্ধে যখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজের সিংহভাগ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে পাকিস্তানি শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলছিল, ঠিক তখনই খেলার মাঠের নায়করা বেছে নিয়েছিলেন আরেক লড়াই। স্বাধীনতা সংগ্রামে তারা গ্রহণ করেছিলেন এক অনন্যসাধারণ নজিরবিহীন অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা। একাত্তরের জুন। তত্কালীন মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে গঠিত হলো ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ওই সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা উল্লেখ করে চিঠির মাধ্যমে ডাকলেন কয়েকজনকে। শুরুতেই দলে যোগ দিতে বলা হলো তাদের। এ সময় মুজিবনগরে প্রথম উপস্থিত হলেন প্রতাপ শংকর হাজরা, সাইদুর রহমান প্যাটেল, শেখ আশরাফ আলী, আলী ইমাম প্রমুখ। এরপর আকাশবাণীতে ঘোষণা দেয়া হলো বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত খেলোয়াড়দের মুজিবনগরে রিপোর্ট করার জন্য। এ ঘোষণা শুনে মুজিবনগর ক্যাম্পে যোগ দিলেন ৪০ জন খেলোয়াড়। সেখান থেকে ৩০ জনকে বাছাই করে গঠন করা হলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। পরে আরও একজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সদস্যসংখ্যা দাঁড়াল ৩১। ৩১ জন খেলোয়াড়, ম্যানেজার, কোচ আর তিন সভাপতিসহ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মোট সদস্যসংখ্যা ছিল ৩৬ জন। দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরা। দলের অন্য খেলোয়াড়রা হলেন আলী ইমাম, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অমলেশ সেন, আইনুল হক, শেখ আশরাফ আলী, বিমল কর, শাহজাহান আলম, মনসুর আলী লালু, কাজী সালাউদ্দিন, এনায়েতুর রহমান, কে এন নওশের উজ্জামান, সুভাষ সাহা, ফজলে হোসাইন খোকন, আবদুল হাকিম, তসলিমউদ্দিন শেখ, আমিনুল ইসলাম, আবদুল মমিন জোয়াদার, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, সাত্তার, প্রানগোবিন্দ কুন্ডু, মুজিবর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) খন্দকার নুরুন্নবী, লুত্ফর রহমান, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জি, সনজিত্ কুমার দে, মাহমুদুর রশিদ, সাইদুর রহমান প্যাটেল, দেওয়ান মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন ও নিহার কান্তি দাস। দলের ম্যানেজার ছিলেন তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না আর প্রশিক্ষক ছিলেন ননী বসাক। এছাড়া দলের প্রথম সভাপতি ছিলেন শামসুল হক, দ্বিতীয় সভাপতি আশরাফ আলী চৌধুরী এবং তৃতীয় সভাপতি ছিলেন এন এ চৌধুরী (কালু ভাই)।
ওই ৩১ জনের দলটি একাত্তরের ২৩ জুলাই মুজিবনগর থেকে পৌঁছল নদীয়ায়। নদীয়ার ডিসি দীপক ঘোষ এবং স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কর্মকর্তারা অভ্যর্থনা জানালেন প্রতাপ শংকর হাজরাদের। সবচেয়ে গৌরবময় দিনটি ছিল ২৪ জুলাই। ওইদিন ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম ম্যাচ। সেদিন ২৪ জুলাই কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে নদীয়া একাদশের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নামল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। এদিন মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে ম্যাচ উপভোগ করতে স্টেডিয়ামে আসে হাজার হাজার মানুষ। খেলা শুরুর আগে জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন দলের সদস্যরা। নদীয়া একাদশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলার আগেই খেলোয়াড়রা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করবেন। বিষয়টি নদীয়া ক্রীড়া সমিতিকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়। এ ম্যাচকে উপলক্ষ করে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে সৃষ্টি হয় ব্যাপক গণজাগরণ। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পোস্টার শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোয় শোভিত হয়। নানা মাধ্যমে শহরজুড়ে চলে ব্যাপক প্রচার। স্বাধীন বাংলা বেতারে ম্যাচের বিষয় জানতে পেরে কুষ্টিয়া জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক উত্সাহী ক্রীড়ামোদী গ্যালারিতে সমবেত হলেন। কিন্তু বিভ্রাট বাধল বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন নিয়ে। ভারতের সরকার তখন পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। বিভ্রান্তির মধ্যেই খেলার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেল। নদীয়া জেলা একাদশ মাঠে উপস্থিত। কিন্তু পতাকা ও জাতীয় সংগীতের বিষয়ে নিষ্পত্তি ছাড়া স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মাঠে নামবে না কিছুতেই। অবশেষে নদীয়ার জেলা প্রশাসক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়ে সম্মত হলেন। জাকারিয়া পিন্টু ও প্রতাপ শংকর হাতে ধরা মানচিত্রখচিত সবুজ পটভূমিতে লাল সূর্য বুকে আঁকা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে খেলোয়াড়রা গগণবিদারী জয়ধ্বনি করতে করতে মাঝমাঠ প্রদক্ষিণ করলেন। আবেগবিহ্বল অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রতিটি বাঙালি খেলোয়াড় পতাকাকে চুম্বন করলেন। বেজে উঠল ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’। জাতীয় সংগীতের মূর্ছনায় ভারতের জাতীয় পতাকার সমর্যাদায় উত্তোলিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। একটি গর্বিত জাতির সমৃদ্ধ ইতিহাসে সূচিত হলো সোনালি অধ্যায়। ম্যাচটি ড্র হয় ২-২ গোলে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে প্রথম গোল করেন শাহজাহান। স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর দায়ে পরদিন চাকরিচ্যুত করা হলো নদীয়ার ডিসিকে। পরে অবশ্য তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল শুধু নামেই ছিল না, ছিল কাজেও। সাফল্যের অনেক পালক যুক্ত হয় এর মুকুটে। ওই বছর ৮ আগস্ট কলকাতার অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি মোহনবাগানের খ্যাতনামা ফুটবলার গোষ্টপালের নামে গড়া একাদশের বিপক্ষে খেলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। মূলত মোহনবাগানের খেলোয়াড়রাই এ দলের হয়ে মাঠে নামেন। এভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ১৬টি ম্যাচ খেলে স্বাধীনতা-সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। আর জয়লাভ ১২টি ম্যাচে। বাকি চারটির একটিতে ড্র আর তিনটিতে বরণ করে পরাজয়। শেষ খেলাটি অনুষ্ঠিত হয় মুম্বাইয়ে, যেখানে মহারাষ্ট্র ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেন ভারতের খ্যাতনামা সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক নবাব মনসুর আলি খান পতৌদি। ম্যাচগুলো থেকে আয় করে তত্কালীন সাড়ে তিন লাখ রুপি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। আয়কৃত সেই পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিযুদ্ধের ফাণ্ডে জমা দেয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর দেশে ফেরেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যরা। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ফুটবলকে চাঙ্গা করতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল কাজ করতে থাকে।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বিভিন্ন স্থানে ম্যাচে অংশগ্রহণ রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুলভাবে উত্সাহিত করে। মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে সৃষ্টি করে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। যুদ্ধ শেষ হলো। ক্রীড়াঙ্গনও যে যুদ্ধপরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিজয়ে বড় অবদান রেখেছিল তা আজ অনেকেই ভুলতে বসেছেন। স্বাধীন বাংলার পতাকাকে প্রথম যারা বিভিন্ন এলাকায় ওড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন, তারা আজ তলিয়ে যাচ্ছেন বিস্মৃতির অতলে। শ্রদ্ধা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতি। শ্রদ্ধা দলের প্রতিটি সদস্যের প্রতি।
চলচ্চিত্র
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ১৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র ‘মুক্তির জন্য ফুটবল’। এছাড়া খিজির হায়াত খান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘জাগো’ তৈরির মূল অনুপ্রেরণা এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।
