মোতাহের হোসেন মাসুম
চার বছরের অপেক্ষা, চার বছরের প্রস্তুতির অবশেষে সমাপ্তি ঘটছে। অবশেষে আজ পর্দা উঠতে যাচ্ছে ওয়ানডে বিশ্বকাপের। অবশেষে আজ ক্রিকেটের মহাযজ্ঞ আরো একবার শুরু হতে যাচ্ছে। আরো একবার বিশ্ব মেতে উঠবে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আনন্দে। কখনো কখনো মনে হয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দাপটে হয়তো ক্রিকেটের অন্য দুই ঘরানা, ওয়ানডে ও টেস্ট বুঝি পথ হারাবে। বাস্তবে এখনো সেরকম হুমকি হয়ে ওঠার মতো কিছু দেখা যায়নি।
বরং সত্যি বলতে কি ক্রিকেটে বিশ্বকাপ বললে এখনো সর্বাগ্রে উঠে আসে ৫০ ওভারের রাজসূয়া আসরটি— যা মাঠে গড়াচ্ছে আজ, ক্রিকেট তীর্থ ইংল্যান্ডের দ্য ওভালে। ক্রমশ শক্তি হয়ে ওঠা বাংলাদেশকে নিয়ে ১০টি দেশ লড়বে ক্রিকেটের এ মহারণ জয়ের জন্য।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলশের মাঠগুলোয় আগামী ছয় সপ্তাহ ব্যাটে বলের লড়াইয়ে যখন ব্যস্ত থাকবে ক্রিকেটের কুলীনরা, সেই সময়ে এদেশেও মাশরাফিবাহিনীর মঙ্গলকামনায় মুখর থাকবেন ক্রিকেটামোদীরা। বাংলাদেশে এমন সমর্থক পাওয়া দুষ্কর হবে না, যারা ভাবেন বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া, রানার্স আপ নিউজিল্যান্ড, দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত, একবার করে জয়ী পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ১৪ জুলাইয়ের ফাইনালে লর্ডসে দেখা যাবে মাশরাফিদেরও।
বাস্তবতা অতটা আশাবাদী হওয়ার মতো নয়। সেটা বোঝেন ক্রিকেটাররাও। তার মধ্যে এবার সবগুলো দল একে অপরের বিরুদ্ধে খেলবে। তাই অধিনায়ক মাশরাফি দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে টাইগারদের লক্ষ্য হিসেবে সেমিফাইনাল খেলাকেই লক্ষ্য হিসেবে জানিয়ে গেছেন। বিশেষ করে যেখানে আগের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তাদের। ইংল্যান্ড লাগোয়া আয়ারল্যান্ডে ইতোমধ্যে তিনজাতির ট্রফি জয় মাশরাফিদের বাড়তি আত্মবিশ্বাসও এনে দিয়েছে। তারপরও এটা মাথায় রাখতে হবে যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গড় সাফল্য কেবল ৩৫.৪৮ ভাগ। সর্বাধিক পাঁচবারের বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে যা ৭৫.৩০ ভাগ।
এবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা পাবেন ৪০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। এছাড়াও আরো ৬০ লাখ ডলার পাবেন বাদ বাকিরা। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে টেলিভিশন পর্দা কিংবা অত্যাধুনিক সব ‘গেজেট’ এর মাধ্যমে ১৫০ কোটি ক্রীড়ামোদী তাদের প্রিয় দলের খেলাগুলো দেখবেন।
মজার ব্যাপার হলো মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ১৯৭১ এর জানুয়ারিতে একটা পুরো অ্যাশেজ টেস্ট বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়ার প্রেক্ষিতেই ঘটনাক্রমে ওয়ানডে ক্রিকেটের আবির্ভাব। ক্রিকেটের বিশ্ব সংস্থা আইসিসি এটাকে বিশ্বকাপে গড়াতে আরো দুবছর সময় নিয়েছিল। বিশ্বকাপের শুরুটা অবশ্য ছিল নারীদের নিয়ে। তারপর ১৯৭৫ থেকে পথ চলা শুরু এই পুরুষ বিশ্বকাপের। উদ্বোধনী আসর ছিল আট দলের, ৬০ ওভারের ১৫টি খেলা নিয়ে, সাদা পোশাকে লাল বলে। খেলোয়াড়দের রঙিন পোশাক এলো আরো পরে, ১৯৯২ আসরে।
বলা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ হবে রেকর্ডের। ইংল্যান্ডে এবার যেভাবে সাড়ে তিনশর উপর রান হচ্ছে, তাতে বোদ্ধাদের ধারণা এ ধারাটা অব্যাহত থাকবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচে গত মঙ্গলবার ৪২১ রান তোলে। কাজেই ওয়ানডের দ্বিতীয় ভাগে পিচ ভিন্ন আচরণ না করে এরকম সংগ্রহও গুড়িয়ে যেতে পারে। তারপরও বলা মুশকিল কে হবে এবারের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন।
বিশ্বকাপের সাফল্য বিচারে অস্ট্রেলিয়াই হচ্ছে সবচে সফল দল। তারা ১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫ আসরের চ্যাম্পিয়ন। স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারের ফেরা দলটির শিরোপা ধরে রাখার সম্ভাবনাকে বাড়িয়েছে। ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও এবার গোনায় রাখছেন বোদ্ধারা। মূলত ক্রিস গেইল, আন্দ্রে রাসেল, সেই হোপের সাম্প্রতিক সাফল্যধারাই পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে আনছে ক্যারিবীয়দের। ফেভারিটের তালিকায় আছে ১৯৮৩ ও ২০১১ আসরের জয়ী ভারতও। উপমহাদেশের অপর দুই বিশ্বজয়ী ১৯৯২ এর চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ও ১৯৯৬ এর ট্রফিধারী শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে এবার অবশ্য আগাম বাজি ধরছে না কেউ। সরফরাজ আহমদের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তো বিশ্বকাপে এলো আগের পনরটি ওয়ানডের মধ্যে ১২টিতে হেরে। তারপরও নিজেদের দিনে এরাও জ্বলে উঠতে পারে। দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে আফগানিস্তান কতটা কি করে তাও নজরে থাকবে অনেকের।
ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডকে নিয়েও আছে বাড়তি আলোচনা। শীর্ষ র্যাংকিয়ে থাকা ইংল্যান্ড ১৯৭৯, ১৯৮৭ ও ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলেও শিরোপা এখনো অধরাই রয়ে গেলে তাদের। নিউজিল্যান্ড তো গেলবারের ফাইনালিস্ট। দক্ষিণ আফ্রিকা শিরোপা জেতার মতো দল হয়েও এখনো ফাইনালেই উঠতে পারেনি। তাদের দৌড় শেষ চার (১৯৯২, ১৯৯৯, ২০০৭ ও ২০১৫) পর্যন্ত।
গেল বিশ্বকাপের পর ৫০ ওভারের খেলায় ইংল্যান্ডই সবচে দাপুটে দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা এখন নিয়মিতই সাড়ে তিনশ রান তুলছে। ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের এক নম্বর ব্যাটসম্যান কিংবা এক নম্বর বোলার তাদের দলে না থাকার পরও তারাই এখন সেরা দল। এক নম্বরের স্থান দুটি আছে বিরাট কোহলি ও জসপ্রিত বুমরাহর দখলে। কিন্তু ইয়ন মর্গানের নেতৃত্বে জো রুট, বেন স্টোকস ও জস বাটলাররা এখন এতটাই একাট্টা হয়ে খেলছে যে বলা হচ্ছে ইংল্যান্ড এবার অন্যদের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে।
অনেকের ধারণা, এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৫শ রানের দেখা মিলতে পারে। গত বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০ বার ৪শ কিংবা তার চেয়ে বেশি রানের ইনিংসের দেখা মিলেছে। ইংল্যান্ড এরকম সংগ্রহ গড়েছে চারবার। অপরদিকে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা উভয়েই পাঁচবার করে এ সংগ্রহে পৌঁছেছিল। এ সংগ্রহগুলোর মধ্যে সেরা দুটিই (৪৪৪/৩ ও ৪৮১/৬) আবার ইংল্যান্ডের। এতকিছুর পরও বিশ্বকাপ বলে কথা এবং দলগুলোকে প্রমাণ দিতে হবে মাঠেই।
