বিএনপি-জাপা হঠাত্ বিতর্কে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২৩:১১
হঠাত্ বিতর্কে মেতেছে সংসদের প্রাক্তন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও বর্তমান প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন বক্তব্যে আক্রমণ করছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে। এরশাদও পাল্টা আক্রমণ করছেন খালেদা জিয়া, বিএনপি ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে। দল দুটির দুই প্রধানের এই বাহাসের মধ্যে দুই দলের মহাসচিবও (তাদের একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব) নেমেছেন বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতির প্রতিযোগিতায়। বিএনপি-জাপার পাল্টা আক্রমণ-বিবৃতি লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ যুক্ত হয়েছে রাজনীতিতে। নতুন করে এই বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন এরশাদ। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে আমার কিছু কথা’ শিরোনামে ১২ জুলাই দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে লেখা এক নিবন্ধে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি এই বিতর্কের সূচনা করেন। গত ৩ জুলাই চলতি সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) সমাপনী দিনে রাখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্যের জবাব দিতেই এরশাদ মূলত ওই নিবন্ধ লেখেন। তবে ১৯৮২ সালে নিজের ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিবন্ধে এরশাদ লিখেছেন, ‘জিয়া সাহেব ক্ষমতায় এসেছেন রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। তার ক্ষমতায় আসার সোপান তৈরি হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তারপর ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরে রক্তে ভেজা পথ পেরিয়ে জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসেছেন। আর আমাকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এবং দেশের স্বার্থে আমি তা গ্রহণ করেছি। জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসেছেন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। আর আমি ক্ষমতায় এসেছি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সামরিক আইন জারির কারণে। জিয়ার সঙ্গে আমার ক্ষমতায় আসার তফাত্ এখানেই।’ যেদিন এরশাদের এই লেখা ছাপা হয়, সেদিনই জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে বক্তব্যের জন্য এরশাদকে ক্ষমা চাইতে বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরশাদের লেখার জবাবে ফখরুল সেদিন বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেননি। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সিপাহী জনতা জিয়াকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। এরশাদই একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে দিয়ে বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতা দখল করেছেন। দেশের রাজনীতির যে কলুষিত চেহারা তার হোতাও এরশাদ। পরদিন মির্জা ফখরুলের ওই বক্তব্যের জবাবে বিবৃতি দেন জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। বিবৃতিতে তিনি জিয়াউর রহমানের ও নিজের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জাতির কাছে এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এইচএম এরশাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। ওই বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্দেশে বাবলু বলেন, কাঁচের ঘরে বসে বাইরে ঢিল ছুঁড়বেন না। বিএনপির জন্ম ইতিহাস, এর কর্মকাণ্ড ও এই দলের প্রতিষ্ঠাতার ক্ষমতায় আসার ঘটনাবলি স্মরণ করতে হবে। এরশাদ আর জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ এক নয়। এরশাদ ক্ষমতায় এসেছেন একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে সামরিক আইন জারির মধ্য দিয়ে। আর জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় এসেছেন ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ডের পথ বেয়ে, শেষ পর্যন্ত ৭৫-এর ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অসংখ্য দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা এবং মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকাণ্ডের সিঁড়ি বেয়ে। বিদ্রোহী দমনের নামে জিয়া কত হাজার সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছেন, সেটির কৈফিয়ত এখন তার উত্তরসূরী স্ত্রীকেই দিতে হবে। সেইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য বেগম জিয়াকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এরশাদ তার লেখা নিবন্ধে ইতিহাস তুলে ধরেছেন। সত্য কথা মির্জা আলমগীর সাহেবের গায়ে সহ্য হয়নি। তাই এরশাদের কাছে ফখরুলকে আগে ক্ষমা চাইতে হবে। বাবলুর বিবৃতির পরদিন, ১৪ জুলাই ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) এক ইফতার পার্টিতে দেয়া বক্তব্যে এরশাদকে ‘খুনি’ বলে আখ্যায়িত করেন খালেদা জিয়া। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, সব খুনি এই অবৈধ সরকারের সঙ্গে রয়েছে। রয়েছে আরেক খুনি এরশাদ। এই খুুনিরা এক হয়ে দেশে আজ খুনের রাজত্ব কায়েম করেছে। একইদিন রংপুরে এক ইফতার পার্টিতে জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ বলেছেন, বিএনপি ও জোট সরকার তিনবার সরকারে ছিল। তখন তারা জিয়া ও মঞ্জুর হত্যা নিয়ে কোনো কথা বলেনি। এখন আমাকে জড়িয়ে নানা কথা বলছে। তার মানে তারা আমাকে ভয় পায়। বিএনপি আমাকে দালাল বলে। আমি দালালও নই, রাজাকারও নই। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আমি যদি হত্যাকারী হতাম তাহলে আমার কাছ থেকে জমি নিলেন কেন? টাকা নিলেন কেন? বাড়ি নিলেন কেন? বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলও ১৪ জুলাই পাল্টা এক বিবৃতিতে জাপা মহাসচিব বাবলুর বিবৃতির জবাব দেন। গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ‘এরশাদ বিভিন্ন কূটচালে রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতা-শ্রমিকনেতাসহ অনেককেই কিনতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কয়েকজনকে ছাড়া এরশাদের কেনা-বেচার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরশাদ যেমন কেনা-বেচা করতে পারেন, ঠিক তেমনিভাবে নিজেও কেনা-বেচার পণ্য হতেও পারঙ্গম। রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, নির্লজ্জ মিথ্যাচার, বার বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও ধর্মের নামে ভণ্ডামির এক মূর্ত প্রতীক হচ্ছেন এরশাদ।’ তিনি প্রকাশ্যে এরশাদের বিচার দাবি করেন। ফখরুলের এই বিবৃতির জবাবে গতকাল মঙ্গলবার আবারও পাল্টা বিবৃতি দেন বাবলু। এই বিবৃতিতে বাবলু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ‘জাপার ঘরের ছেলে’ ও ‘ভাতিজা’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি বলেছেন, ফখরুল পিতার রাজনৈতিক পরিচয়ও ভুলে গেছেন, তার পিতা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন এরশাদ সরকারের ভূমিমন্ত্রী ও জাপার সদস্য ছিলেন। জাপা মহাসচিব এও বলেন, খালেদা জিয়ার হিসাবের খাতায় বহু হত্যা-খুনের দায় জমা হয়ে আছে। এ দেশের এতগুলো সন্তানের প্রাণ কেড়ে নেয়ার জন্য খালেদা জিয়ার প্রকাশ্য বিচার এবং তার দুই দুর্নীতিবাজ পুত্রকে দেশে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে। একইদিন অর্থাত্ গতকাল বিকল্পধারার ইফতার পার্টিতেও এরশাদকে ‘বিশ্ববেহায়া’ ও ‘খুনি’ বলে আখ্যায়িত করেন খালেদা জিয়া। বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া জাপা চেয়ারম্যান এরশাদকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ওই ‘বিশ্ববেহায়া’ ও ‘খুনি’ও আজ তাদের (বর্তমান সরকার) সঙ্গে। শিল্পী কামরুল হাসান তাকে বিশ্ববেহায়া আখ্যা দিয়েছিলেন। বিশ্ববেহায়া ও দুর্নীতিবাজরা সবাই আজ এক হয়েছে। প্রসঙ্গত, কয়েক মাস আগেও জিয়াউর রহমানের খুনি কে, এ নিয়ে বাহাসে জড়ায় বিএনপি ও জাপা।