হাঁসের খামারে স্বাবলম্বী ৫ শতাধিক যুবক

আপডেট : ২৯ মে ২০১৯, ২২:৩২

নিকলী উপজেলার ধনু, সোয়াইজনি, ঘোড়াউত্রা ও নরসুন্দা নদে নৌকায় ঘুরলে দূর থেকে মনে হতে পারে, একটু পর পর বুঝি ঝাঁকে ঝাঁকে শীতের অতিথি পাখি। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এগুলো হাঁস। আর ছোটো ছোটো নৌকায় বসে হাঁসের ঝাঁক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এরা হাঁসের খামারের লোক। হাওরবেষ্টিত এ উপজেলার নদগুলোকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫শ ছোটো বড় হাঁসের খামার গড়ে উঠেছে। স্বাবলম্বী হয়েছে পাঁচ শতাধিক যুবক।

প্রায় ৩০ বছর আগে নিকলীর নগর গ্রামের তিন বন্ধু ইসরাইল মিয়া, আলী হোসেন ও মঞ্জিলহাটির রহিম মিয়া মিলে নিজেদের বাড়িতে ৫০-৬০টি করে হাঁস পালন শুরু করেন। দুই বছর পর ডাকপ্লেগ রোগে হাঁসগুলো মারা গেলে তারা হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু ওই দুই বছরে তাদের হাঁস পালন ও ডিম বিক্রিতে লাভ দেখে মহরকোনা গ্রামের জিল্লু মিয়া তার বাবা আবদুর রহমানের কাছে হাঁস পালনের বায়না ধরেন। ছেলের আবদার রাখতে ঘরে থাকা ৮৬ মণ ধান বিক্রি করে ৩০ হাজার টাকা দেন হাঁস কেনার জন্য। জিল্লু  মিয়া ২৫ হাজার টাকায় সিলেটের বানিয়াচং থেকে ৩শ হাঁস কিনে আনেন। বাকি পাঁচ হাজার টাকা হাতে রাখেন খামার পরিচালনার জন্য। এক মাসের মাথায় ২৫০টি হাঁসই ডিম দিতে শুরু করে। ডিম বিক্রি থেকে প্রতিদিন তার হাতে আসতে থাকে ১৫শ টাকা। বছর দুয়েকের মধ্যে লাভের টাকা থেকে আরো এক হাজার হাঁস কেনেন তিনি। এখন তার খামারে পাঁচ হাজার হাঁস। প্রতিদিন খরচ ছয় হাজার টাকা বাদ দিলেও গড়ে দৈনিক পাঁচ হাজার টাকা লাভ থাকছে তার। এ গল্প শুধু জিল্লু মিয়ার নয়। হাঁস পালন করে এরই মধ্যে নিজের অবস্থা বদলেছেন নিকলীর কয়েকশ যুবক।

মহরকোনা গ্রামের হোসেন মিয়া ২৫০টি হাঁস কিনে শুরু করেন খামার।  বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা এক হাজার। প্রায় একই ধরনের গল্প সদর ইউনিয়নের কালাচান মিয়া, সুমন মিয়া, করম আলী, মালেক মিয়া, কাঞ্চন মিয়া, আলম মিয়া, কালাম মিয়া, কাশেম মিয়া, লোকমান মিয়া, সোনালি মিয়া, রুহুল মিয়া, উসমান মিয়া, সাইফুল ইসলাম, নাসু মাঝি, গিয়াস উদ্দিন ও আলী ইসলামের। এ উপজেলার চাষিরা হাঁস চাষের ক্ষেত্রে বেছে নিয়েছেন অন্য রকম এক পদ্ধতি। এখানকার খামারগুলো নদ কেন্দ্রিক। হাঁসগুলো সারাদিন নদেই থাকে। রাতে নেওয়া হয় নদের পাড়ে অস্থায়ী খামারে।

একাধিক খামারি জানান, নদ-নদী বা হাওরে খামার করলে খরচ হয় কম। খোলা পরিবেশে হাঁস আগাম ডিম দেয়। তবে নদ-নদীতে খাবারের সংকট দেখা দিলে এক হাজার হাঁসের খাবারের জন্য ৩০ খাঁচা শামুক দরকার হয়। প্রতি খাঁচা শামুক ৫০ টাকা। খামারিরা জানান, হাঁস কেনা বাবদ যে টাকা লাগে, সেটিই মূল বিনিয়োগ। যেমন এক হাজার হাঁসের জন্য লাগে তিন লাখ টাকা (প্রতিটি হাঁস গড়ে ৩শ টাকা হিসাবে)। অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে আরো ৪৫ হাজার টাকা। প্রতিদিন ডিম পাওয়া যায় গড়ে আটশ। যার দাম প্রায় সাড়ে ১০ হাজার টাকা। মাসে গড়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ডিম বিক্রি করা যায়। অর্থাত্ প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি লাভ করার সুযোগ থাকে। কার্তিক থেকে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত আট মাস টানা ডিম দেয় হাঁস।

হাঁসের জাত: খামারগুলো ঘুরে মূলত দুই জাতের হাঁস দেখা গেছে। একটির নাম ‘নাগিণী’। এরা সারাদিন নদীতে ঘুরে ঘুরে খাবার খায়। ডিমও দেয় বেশি দিন। অপর জাতটির নাম ‘খাগি’। এ হাঁস ঘোরাফেরা করে কম, শামুক, ধান ও গম দিলে বসে বসে খায়। ডিমও দেয় কম দিন।

খামারিদের অভিযোগ, কর্মকর্তার বক্তব্য: খামারি জিল্লু মিয়া বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে খামারিরা কোনো সহযোগিতা পান না। সরকারি ভ্যাকসিন পেতে হলে টাকা দিতে হয়। খামারে ডাকপ্লেগ বা অন্য কোনো রোগ দেখা দিলে এদের কাছ থেকে কোনো চিকিত্সা বা পরামর্শ পাওয়াা যায় না। অনেক সময় খামারে হাঁসের মড়ক দেখা দিলে অসহায় হয়ে বসে থাকতে হয়। তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ওষুধের সরবরাহ কম থাকায় অনেক সময় চাহিদা মতো ওষুধ দেওয়া যায় না। জনবল কম থাকায় খামারগুলোতে সঠিক সময় যাওয়া সম্ভব হয় না। আমি কোনো দিন টাকা নিয়ে কোনো খামারে চিকিত্সা করিনি। অন্য কেউ করেন কিনা, তা জানি না।