সরকারের ৫৩১ কোটি টাকা মেরে লাপাত্তা পাঁচ কোম্পানি

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২৩:১৪
ছয়টি আন্তর্জাতিক গেটওয়ে অপারেটরের (আইজিডাব্লিউ) কাছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পাওনা ৫৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে খুঁজেই পাচ্ছে না বিটিআরসি। এই আইজিডাব্লিউ’র কাজ বহির্বিশ্বের কলগুলোকে দেশের ফোন অপারেটরদের লাইনে প্রবেশ করিয়ে দেয়া। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিবারের নামে এসব লাইসেন্স নেয়া হলেও এখন আর তারা কেউ এর মালিক নন। যখন ওই প্রভাবশালীদের নামে লাইসেন্স ছিল তখন টাকা উদ্ধারে বিটিআরসির কোন তত্পরতাই ছিল না। যখন তারা লাইসেন্স বিক্রির কথা বলে নাম বদল করে ফেলেছেন তখন তত্পর হয়ে উঠেছে বিটিআরসি। এদের বিরুদ্ধে পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) ও ফৌজদারি মামলাও করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বিনা জামানতে তাদের এত টাকা পাওনা হল কিভাবে? তখন বিটিআরসির তত্পরতা কোথায় ছিল। বিটিআরসি সূত্র জানায়, এই ৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাতুল টেলিকমের কাছে সরকারের পাওনা ৭৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ৫০ শতাংশের মালিক সাবেক স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে সৈয়দা আমরিন রাখি। আরো ২০ শতাংশের মালিক নানকের স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু। তারা টাকা পরিশোধের জন্য ৪ বার সময় নিলেও এখনো পরিশোধ করেননি। সর্বশেষ তাদের সময় রয়েছে ৩০ জুলাই পর্যন্ত। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলাও করেনি বিটিআরসি। অন্য ৫টি প্রতিষ্ঠান হল— ট্যালেক্স লিমিটেড, বেসটেক টেকনোলজী লিমিটেড, ভিশন টেল, কে টেলিকমিউনেশন ও এস এম কমিউনিকেশন। এসব প্রতিষ্ঠানের কল আদান প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে বিটিআরসি। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও পিডিআর মামলাও চলছে। ভিশন টেলের কাছে পওনার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৩৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের মেয়ের কোম্পানি ক্লাউড টেলের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল ভিশন টেল লিমিটেড। তবে অনেক আগেই তারা এই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স হস্তান্তর করেছেন। ফলে এখন আবুল হোসেনের পরিবারের সঙ্গে ভিশন টেলের কোন সম্পর্ক নেই। কে টেলিকমের কাছে পাওনা ৭৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানটি এক সময় ছিল আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের স্ত্রীর নামে। বছর দু’য়েক আগে তিনিও প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দিয়েছেন। শামীম ওসমান ইত্তেফাককে বলেন, তার পরিবার একজন লন্ডন প্রবাসীর কাছে এটি বিক্রি করেছেন। ওই ব্যক্তি তাদের পাওনা টাকা এখনোও পরিশোধ করেনি। বারবার চেক ডিজঅনার হচ্ছে। ট্যালেক্স কমিউনিকেশনের লাইসেন্স নেয়ার সময়ও একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা এতে সুপারিশ করেন। যদিও কাগজপত্রে তার নাম নেই। তাদের কাছে পাওনা ৭২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বেসটেক টেকনোলজীর কাছে পাওনা ১১৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম। তাকে খুঁজে পাচ্ছে না বিটিআরসি। ঠিকানাও ভুয়া। আর এস কমিউনিকেশনের কাছে পাওনা ৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে কে টেলিকম ও এস এম কমিউনিকেশনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে বিটিআরসি। এছাড়া ট্যালেক্স, বেসটেক ও ভিশন টেলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও পিডিআর মামলা এখন চলছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে এদের অফিসের ঠিকানাই ভুয়া। বিটিআরসি এখন এদের কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। শুধু যাদের নামে লাইসেন্স হস্তান্তর হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কিন্তু তাদের আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কি-না তাও নিশ্চিত নয় বিটিআরসি। আইজিডাব্লিউ লাইসেন্স প্রাপ্ত ২৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও অপরটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। বিটিসিএলের কাছে বিটিআরসির পাওনা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আইজিডাব্লিউ বাবদ পাওনা ৫০০ কোটি টাকার মতো। এছাড়া বেসরকারি ২৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২টি বর্তমানে চালু আছে। এদের মধ্যে আবার ৭টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিটিআরসির পাওনা একশ’ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে মোষ্ট টেলিকমের কাছে পাওনা ২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা, এপোল নেটওয়ার্ক লিমিটেডের কাছে ৪২ কোটি ৭২ লাখ, ফার্ষ্ট কমিউনিকেশনের কাছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ, বাংলাটেলের কাছে ৫ কোটি ৮৫ লাখ, ভেনাস টেলিকমের কাছে ৯ কোটি ২০ লাখ, প্লাটিনাম কমিউনিকেশনের কাছে ৪ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং র্যাংগস টেলের কাছে ১৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিটিআরসি বলছে, এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত টাকা দিচ্ছে। ফলে তাদের অপারেশনে বাধা দিচ্ছে না বিটিআরসি। কারো বেশি বকেয়া পড়ে গেলে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।