প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজকে খুঁজে পাচ্ছেন না জেনারেল এম এ মঞ্জুর হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এই অজুহাতে এই হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত রিপোর্ট দাখিল না করে আরো তিন মাসের সময় চাওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ঢাকা মেট্রো) আব্দুল কাহহার আকন্দকে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পাঁচ মাস সময় দিয়েছিলেন। গতকাল আরো তিন মাসের সময় মঞ্জুর করেছেন। যদিও লরেন্স লিফশুলজকে কোথায় কিভাবে খুঁজেছেন এ সম্পর্কে কোন ব্যাখ্যা দেননি তদন্ত কর্মকর্তা। আদালতও কোন ব্যাখ্যা দাবি করেননি।
লরেন্স লিফশুলজ একজন আমেরিকান সাংবাদিক। জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করার সময় (১৯৮২) তিনি ফার ইষ্টার্ন ইকনোমিক রিভিউর (হংকং) দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যার বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রচনা করেন লরেন্স লিফশুলজ। তার এই প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি তথ্য প্রমাণ ও বিভিন্ন জনের সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে দেখান তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের নির্দেশেই জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছিলো। এরশাদই তত্কালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে বাধ্য করেছিলেন পুলিশ হেফাজত থেকে মেজর (অব.) কাজী এমদাদুল হক গংদের হাতে জেনারেল মঞ্জুরকে তুলে দিতে। তার এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাষ্ট্রপক্ষ গত ফেব্রুয়ারি মাসে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন। আদালত প্রথমে দুই মাস এবং পরে আরো তিন মাসের সময় মঞ্জুর করে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তদন্তের কোন অগ্রগতি হয়নি। তদন্ত সম্পন্ন করতে আরো তিন মাস সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে গতকাল আবারো আদালতে আবেদন দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।
গতকাল ওই আবেদনের ওপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) খন্দকার আসাদুজ্জামান রচি ও সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কাসেম খান শুনানি করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে এজলাশে এসে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার হাসান মাহমুদ ফিরোজ সময়ের আবেদন দেখে পিপিকে বলেন, ইতপূর্বে তিন মাস সময় দিয়েছিলাম। আজ (মঙ্গলবার) আবারো সময় চাচ্ছেন কেন? এ পর্যায়ে পিপি বলেন, তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। এজন্য আবারো সময় চেয়েছি। সময় পেলে আশা করি তদন্ত শেষ করা যাবে। তখন বিচারক পিপির উদ্দেশে বলেন, আদালত আপনাদের সময় দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়কে তো কাজে লাগাতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে (পিপি) এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। জবাবে পিপি বলেন, আমি তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি তদন্তের স্বার্থে দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। ইতমধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা জেনারেল মঞ্জুরের স্ত্রীর সঙ্গে আমেরিকায় গিয়ে সাক্ষাত্ করেছেন। মঞ্জুরের পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও তিনি কথা বলবেন। এছাড়া একজন বিদেশি সাংবাদিককে (লরেন্স লিফশুলজ) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই সাংবাদিককে পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এ পর্যায়ে বিচারক বলেন, কতদিন সময় প্রয়োজন? পিপি বলেন, তিন মাস সময় দরকার। এরপর আদালত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সময় মঞ্জুর করে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করে দেন।
এদিকে এই মামলার আসামি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় গতকাল তার পক্ষে আদালতে হাজিরা দেন আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম। শুনানিকালে মামলার অপর দুই আসামি মেজর (অব.) কাজী এমদাদুল হক ও লে. কর্নেল মোস্তফা কামাল উদ্দিন আদালতে হাজির ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৮১ সালে মুক্তিযোদ্ধা-সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। তত্কালীন সেনাপ্রধান এরশাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে ঘটনার ১৪ বছর পর ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলাটি করেন নিহতের ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুর আহমেদ। ১৯ বছর ধরে মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
