রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থে বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৫
অনিয়ম, অব্যস্থাপনা আর অন্তর্দ্বন্দ্বের ষোলকলা পূর্ণ করে অবশেষে একটি বেসরকারি কোম্পানীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে লন্ডনে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ সেন্টার। পশ্চিম লন্ডনের অভিজাত এলাকা রয়্যাল বরোতে অবস্থিত বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন এ বিশাল ভবনটির পরিচালকরা রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের নামে সাহায্য তুলে তা দিয়ে সেন্টারের বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হেলথ অ্যান্ড সেইফটি স্ট্যান্ডার্ড (স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা মান) বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় সেন্টারটিকে ১৩ হাজার পাউন্ড (প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা) জরিমানা করে স্থানীয় হেমারস্মীথ ম্যাজিট্রেট কোর্ট। আর সেন্টারের জেনারেল সেক্রেটারির পদে দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহাল আছেন যুক্তরাজ্য জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান। পদাধিকার বলে এ সেন্টারের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান হচ্ছেন ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার। জানা গেছে, পরিচালনা বোর্ড, ট্রাস্টি এবং সদস্যদের সাথে পরামর্শ ছাড়াই সেন্টারটিকে সম্প্রতি একটি ডেভেলপার কোম্পানীর কাছে ৭ বছরের জন্য লীজ দেয়া হয়। আর এ নিয়ে সেন্টারের দীর্ঘদিনের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করে সেন্টারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিশেষ করে জেনারেল সেক্রেটারির বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ আনেন একাধিক ট্রাস্টি ও সদস্য। তারা অভিযোগ করেন বাজার মূল্য যাচাই না করে অতি অল্প ভাড়ায় সেন্টারটি লীজ দেয়া হয়েছে। তারা দাবি করেন সেন্টারটিকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা গেলে ব্যবস্থাপনা ব্যয় মিটিয়ে লাভ করা সম্ভব। লন্ডনে বাংলাদেশের প্রথম দূতাবাস হিসাবে ব্যবহূত ঐতিহ্যবাহী এ ভবনটি তারা হাতছাড়া করার ঘোর বিরোধী। তবে ইত্তেফাকের সাথে আলাপকালে তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান। ভবনটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১১ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১শ ৪৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা)। উপরের তলার আবাসিক রুমের ভাড়া দিয়ে মূলত ব্যবস্থাপনা ব্যয় নির্বাহ করা হয় এই ভবনের। আর এ রুম ভাড়া নিয়ে রয়েছে নানা অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। এক ব্যক্তি দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে জেনারেল সেক্রেটারির পদে বহাল থাকা নিয়ে ট্রাস্টি এবং সদস্যদের মধ্যে রয়েছে নানা অসন্তোষ। গত বছর রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সেন্টারের পক্ষ থেকে আর্থিক সাহায্য তোলা হলেও সেই অর্থ আজো পায়নি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা। ঐ অর্থ দিয়ে সেন্টারের বকেয়া বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অন্যদিকে সেন্টারের হেলথ অ্যান্ড সেইফটি রক্ষায় ব্যর্থতার দায়ে ১৩ হাজার পাউন্ডেরও বেশি অর্থ জরিমানা গুণতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। একটি সূত্রে জানা যায়, সেন্টারের তহবিল শূন্য হওয়ার কারণে লীজ পাওয়া ডেভেলপার কোম্পানীর অর্থে কিস্তিতে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। সেক্রেটারি মুজিবুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, সেন্টারের প্রায় ৬৫ হাজার পাউন্ডের অধিক ঋণ রয়েছে। ডেভেলপার কোম্পানী অনুদান বাবদ সেন্টারের এ ঋণ পরিশোধ করবে। আর ৭ বছর লীজের বিনিময়ে কোম্পানীটি সেন্টারটির প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে এবং প্রতি মাসে সেন্টারকে ২ হাজার পাউন্ড করে দেবে। কিন্তু আগামী ৭ বছর যাবত্ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ভবনের উপর তলার ভাড়া পাবে। সেন্টারের নিচ তলা বাংলাদেশ সেন্টার আগের মত ব্যবহার করবে বলে জানান তিনি। মুজিবুর রহমান বলেন, রানা প্লাজার অর্থ আগামী দু’এক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে দিয়ে দেয়া হবে। তিনি বলেন, সেন্টারটি চালানো সম্ভব হচ্ছে না বিধায় এটি রক্ষায় সংস্কার কাজের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিশিষ্ট মানবতাবাদী নেতা ‘ওয়ার অন ওয়ান্টের’ চেয়ারপার্সন ডোনাল্ড চেজওয়ার্থের প্রত্যক্ষ সাহায্যে এ বাড়িটি নামমাত্র মূল্যে ভাড়া নেয়া হয়। চেজ ওয়ার্থ তখন ব্রিটিশ ট্রাস্ট ‘টক এইচ’ আন্তর্জাতিক হোস্টেলের ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় পুরো ভবনটি কিনে নেয়া হয়। এতে বিলেতের বাঙালিরাও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন। বিগত বছরগুলোতে মোট ৮০ জনকে সেন্টারের স্থায়ী মেম্বার করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকে দিয়েছেন এক হাজার পাউন্ড করে। বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিষয়টি সম্পর্কে হাইকমিশনার মিজারুল কায়েসের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।