ভরা কাটালের জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে দেশের উপকূলীয় ছয় জেলার গ্রাম জনপদ। ভোলা, নোয়াখালীর অংশ বিশেষ, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, বরগুনা এবং ভাণ্ডারিয়া ও কাউখালিসহ পিরোজপুর জেলার বহু বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। রান্না করার জন্য এক চিলতে শুকনো জায়গাও নেই কোন কোন বাড়িতে। একই সঙ্গে কোন কোন এলাকায় ভারী ভর্ষণ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে।
গত ১২ জুলাই পূর্ণিমা শুরুর পর সমুদ্রের পানি স্ফিত হয়ে নদীর পানি বাড়তে থাকে। ১৯ জুলাই পূর্ণিমা শেষে পানি কমতে শুরু করবে। এদিকে জোয়ারের পানিতে ডুবে ভোলার মনপুরায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বরিশালে সন্ধ্যা, আড়িয়াল খাঁ ও সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গনে হুমকির মুখে পড়েছে বরিশাল বিমান বন্দর ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু (দোয়ারিকা সেতু)। এনায়েতপুরে খাজা ইউনুছ আলী মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিরুল হোসেন জানান, ভরা কাটালের জোয়ারে প্রতি বছরই দু’বার বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়- একবার জুলাইয়ে একবার অক্টোবরে।
কিন্তু এবার জোয়ারের পর ভাটার সময় যতটুকু পানি নেমে যাওয়া প্রয়োজন ছিল ততটুকু পানি নামছে না। ফলে প্লাবন ব্যাপক হয়ে উঠেছে। তবে পানির উচ্চতা স্থান ভেদে একেক রকম হয়। হিরণ পয়েন্টে সর্বোচ্চ ৩ মিটার পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি পায়। টেকনাফ ও সংলগ্ন এলাকায় জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পায় সবচাইতে কম। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ১৯ জুলাই পূর্ণিমার অবসান হবে। তখন পানি নামতে শুরু করবে।
জোয়ারের পানি ও ভারী বর্ষণে উপকূলীয় এলাকার জেলায় ফসলের জমি, গোচারণ ভূমি ডুবে গেছে। ফলে কৃষিজীবী গ্রামীণ মানুষ চরম দুর্ভোগে শিকার হচ্ছে। পুকুরের মাছও ভেসে গেছে অনেক এলাকার। জ্বালানি কাঠেরও সংকট দেখা দিয়েছে। দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের কষ্ট সবচাইতে বেশি। বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ডালিয়ায় তিস্তা নদী, ধরাইয়ে পুরাতন সুরমা এবং বরগুনার পাথরঘাটা নদীর পানি গতকাল বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। পানিতে ডুবে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওমরের (৩) বাড়ি হাজীর হাট ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডে। মিজানের (৬) বাড়ি দ. সাকুচিয়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডে এবং মরিয়মের (৫) বাড়ি ১ নং মনপুরা ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডে। পানির উচ্চতা বাড়ায় জোয়ারের পানির তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। মানুষের ঘর বাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মনপুরায় ১৫ গ্রামের পানিবন্দী অর্ধলক্ষাধিক মানুষ বর্তমানে ভুগছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে। জোয়ারের পানিতে এলাকা ভরে গিয়ে সে পানি না বের হতেই আবার জোয়ার এসে প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে পুরো এলাকা।
পানিবন্দী হয়ে জাতীয় বোর্ড থেকে বের হতে পারছেন না।
এক মত্স্য চাষি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষে বিনিয়োগ করেছি। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। কিভাবে যে ঋণ পরিশোধ করবো ভেবে পাচ্ছি না। কৃষকের ক্ষেতের আমন ধানের বীজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারের আমন মৌসুমে কৃষকদের পুনরায় বীজতলা তৈরি করে ফসল ফলাতে বেগ পেতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, পানিবন্দী এলাকা পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, নদী ভাঙ্গনে মঙ্গলবারও বাবুগঞ্জের একটি ইটভাটা ও বসতঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঘর রক্ষা করতে গিয়ে স্বপন বেপারীসহ ৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গনে ইট ভাটা, বসতঘর দেবে যায়। সেটি রক্ষার চেষ্টাকালে ঘরের মালিক স্বপন বেপারীসহ ৪ জন নদীতে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। নদী ভাঙ্গনে শাহ আলম মোল্লা, জামাল হোসেন পুতুলের ৫টি ঘর হুমকির মুখে পড়েছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ, সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙনের ফলে প্রতি বছরই উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটি ইউনিয়নই নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে।
মীরগঞ্জ বাজার, ফেরিঘাট, বরিশাল বিমানবন্দর, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজার, আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার চরম হুমকির মুখে। বিমানবন্দর ও দোয়ারিকা সেতুর উত্তর পাশে সুগন্ধা নদীর ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় এ দুটি স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে।
মারুফা মির্জা-চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যথাযথ তদারকি না থাকার পাশাপাশি এবং ঢিলেঢালা ভাবে প্রতিরোধ কাজ চলায় আকস্মিক ভাবে ভেঙ্গে গেছে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে অবস্থিত দেশের বৃহত্ খাজা ইউনুছ আলী মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা বাঁধ। মঙ্গলবার রাতে বাঁধের প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা ভেঙ্গে যাওয়ায় ১২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া ভেঙ্গে গেছে বাঁধের দু’পাশে বসবাসরত অর্ধশতাধিক ঘর-বাড়ি। তবে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙ্গন প্রতিকারে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় এলাকা জুড়ে আতংকের সৃষ্টি হয়েছে।
কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, স্বল্প খরচে বিশ্বের আধুনিক চিকিত্সা এবং যুগোপযোগী শিক্ষা দানের লক্ষ্যে কলেজ হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও নার্সিং ইন্সটিটিউট অলাভজনক জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থাপন করেছি। বর্তমানে এ স্থাপনা নদী ভাঙ্গনের দ্বারপ্রান্তে। তাই যমুনার কড়াল গ্রাস থেকে এই সম্পদকে বাঁচানোর জন্য সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পাউবোর এসডি শরিফুল ইসলাম জানান, স্পারের ফাঁটল রোধে পাথর ড্রামপিং চলছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, কচা ও সন্ধ্যা নদীর পানি চার থেকে পাঁচ ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার নদী তীরবর্তী ৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। জোয়ারের স্রোতের আঘাতে অনেকের ভিটেমাটি সরে যাচ্ছে। প্লাবিত গ্রামের মধ্যে রয়েছে বীজতলা। অধিকাংশ এলাকায় চুলায় রান্নার কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। জোয়ারের পানির স্রোতের তীব্রতায় পাকা সড়কের অনেক অংশের ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শহীদুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
বাগেরহাট ও চিতলমারী প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটের আরও ৩ উপজেলা চিতলমারী, ফকিরহাট ও সদর উপজেলার কমপক্ষে ২০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ঘর-বাড়ি ও অসংখ্য চিংড়ি ঘের।
প্লাবিত নতুন এলাকার মধ্যে রয়েছে, বাগেরহাট সদরের রহিমাবাদ, মগড়া বাগমরা, চাপাতলা, যাত্রাপুর, বারইপাড়া, হালিশহর, রাখালগাছি, খানপুর, বেমরতা, খালিশপুর, ফকিরহাটের পুটিয়া, গুড়গুড়িয়া, গেয়ালবাড়ি ও চিতলমারী উপজেলার ডুমুরিয়া, খিলিগাতি, সুড়িগাতি, জালডাঙ্গা, আড়ুলিয়া, রায়গ্রাম, বড় সিঙ্গা, ছোট সিঙ্গা, পারকোড়ালিয়া। এছাড়া মঙ্গলবার রাতে ফকিরহাট ও চিতলমারী উপজেলার চিত্রানদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কয়েকটি এলাকা পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
কলাপাড়া সংবাদদাতা জানান, কলাপাড়ার ৩টি ফেরি ঘাটের পন্টুন ও গ্যাংওয়ে ডুবে গেছে। অতিরিক্ত পানির চাপে আন্ধারমানিক, হাজীপুর ও রামনাবাদ নদীর উপর ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে এবং সংযোগ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট রুটের বাস ও বিভিন্ন যান পারাপারের বিঘ্ন ঘটে।
বেতাগী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান,
বিষখালী নদীর পানি বৃদ্ধি ও রক্ষা বাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে বেতাগী পৌর শহর ও পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গত ছয় দিনে বজলুর রহমান সড়ক, সদর রোড, আবের মল্লিক সড়ক, ডাকবাংলো সড়ক ৩-৪ ফুট জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়।
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান,
গতকাল পর্যন্ত টানা ৪দিনে রায়পুর উপজেলার চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের (সিআইপি) ভেড়িবাঁধের বাহিরে চরবংশী, চরকাছিয়া, চরঘাসিয়া, চরজালিয়া, কানিবগারচরের ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর প্লাবিত হয়ে ডুবে গেছে। এসব চরে প্রায় ৭০ হাজার লোক বসবাস করে থাকেন।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টঙ্গীবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চল দ্রুত পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার হাসাইল পদ্মা নদীতে পানির স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় কামাড়খাড়া ইউনিয়নের বড়াইল, বাঘবাড়ি অঞ্চলে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।
দশমিনা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা প্লাবিত। শত শত মানুষ পানিবন্দী। উপজেলা প্রশাসনের উদ্ধার তত্পরতা নেই। এখনও পৌঁছেনি ত্রাণ।
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, চরফ্যাশনে ৫টি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ গত ৫দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে । উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আখন জানান, জোয়ারের পানিতে চরমাদ্রাজ ইউনিয়নে ৫০হাজার, হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৩টি ওয়ার্ডে ১০হাজার,আছলামপুর ইউনিয়নের ২টি ওয়ার্ডে ১০হাজার এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপ কুকরী মুকরী, ঢালচর ও পাতিলায় ৫০হাজার লোক পানিবন্দী অবস্থায় আছে।
