ভাঙা বেড়িবাঁধ সংস্কার হয়নি হু হু করে ঢুকছে পানি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৩
দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে জোয়ারের পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। সেখান দিয়ে হু হু করে লোকালয়ে ঢুকছে জোয়ারের পানি। চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন স্থানীয়রা। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতের দাবি উঠলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে দিন কাটাচ্ছেন এলাকার লোকজন। সরকারের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত ত্রাণ পাঠানো হয়নি এসব এলাকায়। পানিতে ডুবে গেছে নলকূপ, ফসলি জমি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট। ভেসে গেছে ঘের ও পুকুরের মাছ। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর: ফকিরহাট (বাগেরহাট): বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মত্স্য ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। রান্নার চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শুকনো খাবার খেয়ে রোজা ও ইফতার করছেন পানিবন্দি মানুষ। পাউবো বেড়িবাঁধ নির্মাণে বারবার আশ্বাস দিলেও এখনও করেনি। উপজেলার গুড়গুড়িয়া এলাকায় নামমাত্র একটি বেড়িবাঁধ থাকলেও অমাবশ্যা ও পূর্ণিমায় জোয়ারের পানিতে তা উপচে পড়ে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলার কারণে মত্স্য ঘের ও কৃষি ফসল জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : সীতাকুণ্ড বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ এলাকার বেড়িবাঁধ এক দশক আগে ভাঙলেও তা সংস্কার করা হয়নি। যার ফলে প্রতিদিন জোয়ারের সময় সাগরের লোনা পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। মানবেতর জীবন-যাপন করছে উপকূলের ছয়টি গ্রামের ২০ হাজার মানুষ। চাষাবাদ হচ্ছে না প্রায় দুই হাজার একর জমিতে। গ্রামবাসী ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ সংস্কারের দাবি জানিয়ে বারবার আন্দোলন করলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। গতকাল বিকাল তিনটার দিকে বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে প্রবল স্রোতে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বোয়ালিয়ারকুল, করম আলী চৌধুরীপাড়া, জমাদারপাড়া, মাঝামাঝিপাড়া, আকিলপুর ও কুমিরা ইউনিয়নের দেলীপাড়া গ্রামের পানি ঢুকে বাড়িঘর তলিয়ে যায়। মাত্র আধাঘন্টা সময়ের মধ্যে বাড়িঘরে পানি ঢুকে কোন কোন ঘর পুরো ডুবে যায়। বেড়িবাঁধটি সংস্কারের জন্য বহুবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে ধরনা, এমনকি মহাসড়কের পাশে মানববন্ধনসহ নানারকম কর্মসূচি পালন করেছে স্থানীয়রা। মন্ত্রণালয়সহ কোন দপ্তরই বেড়িবাঁধটি সংস্কার করেনি। বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত আলী জাহাঙ্গীর বলেন, বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য উপজেলার সমন্বয় সভায় বারবার দাবি জানিয়েছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথেও বারবার যোগাযোগ করেছি। এত কিছু করার পরও আশ্বাস ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ছয়টি গ্রামে প্লাবনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। ত্রাণ সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি তালিকা পাঠিয়েছি। মনপুরা (ভোলা) : প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ ৬ দিন ধরে পানিবন্দি। দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট। এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। টিউবওয়েল জোয়ারের পানিতে ডুবে আছে। মানুষ রান্না-বান্না করার জন্য চুলা জ্বালাতে পারছে না। ঘরের মধ্যে মাচার উপর চুলা বসিয়ে জোয়ারের পানি দিয়ে রান্না-বান্না করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অবহেলার কারণে তারা আজ জোয়ারের পানিতে ভাসছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, দুর্গত এলাকার মানুষকে আমরা এরই মধ্যে সতর্ক করেছি। তারা যেন দূর থেকে একটু কষ্ট করে হলেও যেন বিশুদ্ধ খাবার পানি পানও ব্যবহার করে। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলেছি পানিবাহিত রোগ সংক্রান্ত যাবতীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখার জন্য। ভোলা (দক্ষিণ) : ভোলা শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর এবার দৌলতখানের ভবানিপুর ও সৈয়দপুর অংশে মঙ্গলবার রাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। দৌলতখানের ইউএনও জানান, সমগ্র দৌলতখান উপজেলায় জোয়ারের পানিতে দশ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজিপুর ও মদনপুরের হাজারো মানুষ মেঘনার জোয়ারে ডুবছে ও ভাসছে। বোরহান উদ্দিন উপজেলার সীমান্তবর্তী বেড়িবাঁধও হুমকির সম্মুখীন। এদিকে চরফ্যাশন উপজেলার এক লাখ মানুষ ডুবে আছে জোয়ারের পানিতে। সাম্রাজ্য এলাকার মত্স্য ঘাটও ভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার পথে। সাম্রাজ্য থেকে বেতুয়া পর্যন্ত ৭ কিমি. বেড়িবাঁধ মাত্র ১ সপ্তাহে জোয়ারের পানির চাপে ভেঙ্গে যাওয়ায় চরফ্যাশনের অর্ধেক এলাকা ৫ দিন যাবত্ পানির নিচে। এ বাঁধ দ্রুত নির্মাণ না করলে পানি বন্দি থাকবে লক্ষাধিক মানুষ। পটুয়াখালী : জোয়ারের স্রোতের তোড়ে সাগর ও রামনাবাদ নদীর মোহনায় কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ও নিজামপুর এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে সেখানকার ১৩ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দেড় সহস্রাধিক পরিবার জোয়ারের সময় বেড়িবাঁধের উপরে কিংবা অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। লালুয়া ইউনিয়নের মানুষের জানমাল রক্ষায় সত্তর দশকে নির্মাণ করা হয় বন্যানিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে লালুয়ার ৪৭/৫ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের কিছু এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ অবস্থায় সেখানে অভ্যন্তরে নির্মাণ করা হয় বিকল্প বেড়িবাঁধ। জোয়ারের প্রবল স্রোতের তোড়ে এই বিকল্প বেড়িবাঁধের প্রায় তিনশ’ ফুট সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এতে চাড়িপাড়া, পশরবুনিয়া, বানাতিপাড়া, ১১ নম্বর হাওলা,বানাতিপাড়া, ধঞ্জুপাড়া ও নয়াকাটা গ্রাম রামনাবাদ নদীর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও, নাওয়াপাড়া ক্লোজারের প্রায় দেড়শ ফুট বাঁধ রবিবার দুপুরে জোয়ারে জলোচ্ছ্বাসে ভেঙ্গে নাওয়াপাড়া, বড়পাঁচ নং, ছোট পাঁচনং ও মুন্সীপাড়া গ্রামের প্রায় ৬শ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় ইউপি সদস্য দিলীপ গাজী জানান। নিজামপুর এলাকার ৪৭/১ পোল্ডার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে অভ্যন্তরে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। কলাপাড়া পানিউন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শফিউদ্দীন জানান, লালুয়া এলাকার বেড়িবাঁধের ৭ কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প তৈরি করে বাজেট চাওয়া হলেও পাওয়া যায়নি। সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বিকল্প বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ২ কোটি টাকা চাওয়া হলেও বরাদ্দ দেয়া হয় মাত্র ১০ লাখ টাকা। কলাপাড়া (পটুয়াখালী): টানা সাতদিনের অস্বাভাবিক জোয়ারের তাণ্ডবে বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হওয়া লালুয়ার রামনাবাদপাড়ের দুই সহস াধিক পরিবারের জীবন ও সম্পদ রক্ষার দাবিতে ১২ কিলোমিটার দূর থেকে কলাপাড়া শহরে এসে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধন শেষে কলাপাড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। বৃহস্পতিবার দুপুরে চরম বিপদাপন্ন শত শত নারী-পুরুষ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেয়। জিয়ানগর (পিরোজপুর) : জোয়ারের পানিতে বন্দি উপজেলার ২০ টি গ্রামের মানুষ। বিশেষ করে কঁচা ও বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী চাড়াখালী, সেউতিবাড়িয়া, কালাইয়া, ইন্দুরকানী, দক্ষিণ ইন্দুরকানী, খেজুরতলা, গাবগাছিয়া, দেবীপুর, বালিপাড়া, চন্ডিপুর, কলারন, খোলপটুয়া, সাউদখালী, চরবলেশ্বর, পশ্চিম বালিপাড়া, টগড়া, পাড়েরহাট, উমেদপুর, টেংড়াখালী, কালিবাড়ি নিয়মিত জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। কর্মজীবীদের হাতে কাজ নেই। জোয়ারের পানির তোড়ে পাড়েরহাট ও বালিপাড়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। মাছের ঘের ও পুকুর ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চাষিরা। অপর দিকে বীজতলা ডুবে দিশেহারা কৃষক। দুর্ভোগের শিকার অসহায় মানুষের হাতে এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। জোয়ারের পানিতে টগড়া ফেরি ঘাটের গ্যাংওয়ে ডুবে যাওয়ায় যাত্রীদের মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে। চাড়াখালী গুচ্ছগ্রামের সাফিয়া বেগম (৫৫) বলেন, ভাত রাইন্দা খামু হে উপায়ও নাই। চুলায় পর্যন্ত পানি ওঠছে। মাইয়া পোলা লইয়া কই যামু। মোগোতো দেহার কেউ নাই। বালিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মঞ্জু জানান, জোয়ারের পানিতে আমার এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কোন শেষ নেই। জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ প্রয়োজন। মহেশখালী (কক্সবাজার): মহেশখালী পৌরসভার চপাড়া, কুতুবজোমের ঘটিভাঙ্গা, মাতারবাড়ীর রাজঘাট, ধলঘাটার সুতরিয়া ও সরইতলাসহ বেশকিছু এলাকা সাগরের অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্গত লোকজনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা প্রয়োজন হলেও পৌছেনি সহায়তা। ইউপি সদস্য নুরুল আমিন খোকা জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি জানাচ্ছি। এছাড়া জরুরি ত্রাণও দরকার আমাদের। মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনোয়ারুল নাসের জানান, জরুরি সাহায্য চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৭০টি বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বাগেরহাট:অস্বাভাবিক জোয়ারের স্রোতে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও বাগেরহাট সদর উপজেলার বহু জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে অনেক পরিবার। বেড়িবাঁধ না থাকায় পৌরসভা সদরসহ কয়েকটি ইউনিয়নের অনেক কাঁচা, পাকা ও পিচ ঢালাই রাস্তা ধসে গেছে। রাস্তার কমপক্ষে দুই ফুট উপর থেকে স্রোত বয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০ কিলোমিটার কাঁচা পাকা রাস্তার ক্ষতি হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচীর অনেক কাঁচা রাস্তা ও পৌরসভায় নবনির্মীত কয়েকটি পাকা রাস্তার ইট, বালু, খোয়া ভেসে গিয়ে গভীর খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।