ইউক্রেনে মালয়েশীয় বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২৯৫

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৩
মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহি বিমান গতকাল বৃহস্পতিবার ইউক্রেনে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে বিমানের ২৯৫ আরোহীর সবাই নিহত হয়েছেন। আরোহীদের মধ্যে ছিলেন ২৮০ জন যাত্রী এবং ১৫ জন ক্রু। বোয়িং ৭৭৭ বিমানটি নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম থেকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর যাচ্ছিল। ইউক্রেনের রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শক্ত ঘাটি ডোনেটস্ক এবং লুবানস্কের মাঝামাঝি ওই অঞ্চলটিতে বিদ্রোহীদের সাথে সরকারি বাহিনীর লড়াই চলছে এবং বিমানটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে তারা উল্টো দাবি করেছে, ইউক্রেন সরকারই বিমানটিকে বিধ্বস্ত করেছে। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে কোনো পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়নি। এক ব্যক্তির মোবাইল ফোনে বিমানটি বিধ্বস্ত হবার পরের দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, কালো ধোঁয়া বের হয়ে আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে। গত মার্চ মাসের ৮ তারিখ ২৩৯ জন যাত্রী নিয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহি বিমান বোয়িং ৭৭৭। আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তা নিয়ে কয়েকটি দেশের সম্মিলিতি প্রচেষ্টায় কয়েকমাস ধরে খোঁজাখুজি করেও বিমানটির নিখোঁজ রহস্যের কিনা করা যায়নি। সেই বিমানের ২৩৯ জনের সঙ্গে এবার আরো ২৯৫ জন আরোহী জীবন দিলেন মালয়েশীয় এয়ারলাইন্সে। মালয়েশিয়ার এয়ারলাইন্স দুর্ঘটনার আগ মুহুর্তে বিমানটির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার কথা নিশ্চিত করেছে। তারা বলছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় বিমানটি ইউক্রেনের আকাশে ছিল। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা আন্তন গেরাশেংকো বলেছেন, রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্রোহীরা এই ধরনের বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। বিধ্বস্ত হওয়ার সময় বিমানটি ৩৩ হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়ছিল। গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি পূর্ব নির্ধারিত ফোনালাপের সময় পুতিন ওবামাকে বিমান বিধ্বস্ত হবার খবরটি দেন। ওবামাকে পুতিন জানান, তিনি এই ঘটনায় মর্মাহত। ওবামা বলেন, তিনি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে মার্কিন বিশেষজ্ঞদের নির্দেশ দিবেন। স্থানীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ইন্টারফ্যাক্স জানায়, বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সময় ১২ টা ১৪ মিনিটে বিমানটি উড্ডয়ন করে। আর ১৪টা ১৫ মিনিটে ইউক্রেনের শাখতেরেস্ক এলাকায় এটি বিধ্বস্ত হয়। রুশ সীমান্ত থেকে স্থানটির দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। বিমানটি রাশিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশের কিছুক্ষন আগেই এর সাথে কন্ট্রোল টাওয়ারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিমানের ধ্বংসাবশেষ, যাত্রীদের মরদেহ এবং তাদের লাগেজপত্র অন্তত ১৫ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বিমানটি মাঝ আকাশেই একাধিক টুকরো হয়ে যায়। ডনেটস্কের ব্রাবোভো নামক একটি গ্রা েএখানে সেখানে কয়েক ডজন লাশ আকাশ থেকে উড়ে গিয়ে পড়ে। এতে গ্রামবাসীরা আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধানকারীরা কয়েক গোটা এলাকায় খুঁজে দেড় শতাধিক আরোহীর লাশ কুড়িয়ে পায়। বিবিসির একজন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, ৩২ হাজার ফুট (প্রায় ১০ কিলোমিটার) উচু থেকে একটি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করতে গেলে রাডারচালিত ও দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন। তাই বিদ্রোহীদের সংগ্রহে যে ধরনের বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইল থাকে তা দিয়ে ১০ কিলোমিটার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান ভূপাতিত করা কঠিন। এক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধবিমান থেকে ‘এয়ার-টু-এয়ার’ মিসাইল দিয়ে বিমানটি ধ্বংস করার সম্ভাবনা বেশি। তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র স্যাটেলাইট চিত্র পরীক্ষা করে দেখতে পারে বিমানটিতে কোনো ধরনের ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল কি না। ইউক্রেন অভিযোগ করেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আধুনিক মিসাইল ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া। সেগুলো ব্যবহার করা হতে পারে। এদিকে, বিমান বিধ্বস্ত হবার ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রেজাক। তিনি এই দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইউক্রেনের ওই অঞ্চলের মাঠে কাজ করিছিলেন এক কৃষক। তিনি স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমি ট্রাক্টরের উপর বসে ছিলাম। এমন সময় একটি বিমান উড়ে যাবার শব্দ শুনি। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিশাল ‘বিস্ফোরণ’। তাকিয়ে দেখি আগুনের ফুলকি চারদিকে ছুটে যাচ্ছে আর জ্বলন্ত বিমানটি মাটির দিকে সো সো করে নেমে আসছে। এটি মাটিতে পড়েই কয়েক টুকরো হয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। সেরগেই নামের আরেক রুশপন্থি বিদ্রোহী বলেন, আমি আমার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাত্ করে বিমানটি অনেক উচু থেকে নেমে আসতে দেখি। পরপর দুবার বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই আমি। বিদ্রোহীরা বিমানটি ভূপাতিত করেছে এমন সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, এত উচু দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান একমাত্র আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল দিয়ে বিধ্বস্ত করা সম্ভব। আমাদের কাছে তেমন প্রযুক্তি এবং সক্ষমতা নেই। একটি দেশের সরকারের কাছে কেবল তা থাকা সম্ভব। বিমানটি বিধ্বস্ত হবার খবরে দুঃখ প্রকাশ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো। তিনি বলেন, এটা হূদয়বিদারক ঘটনা। কয়েকদিন আগে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছিল বলে জানান। তিনি বলেন, ইউক্রেন সামরিক বাহিনী কখনো বিমান গুলি করে নামানোর চেষ্টা করেনি। এদিকে, বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তারা অনুসন্ধান চালাবেন ইউক্রেনের ওই বিপজ্জনক এলাকা দিয়ে কেন পাইলট বিমানটি নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ইউক্রেন সেনাবাহিনীর লড়াই চলছে এটা সবার জানা। তারপরেও জ্বালানী বাঁচানোর জন্য বিমানটি সেখান দিয়ে চালানো হয়েছিল কি না তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। গত এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বিমান কোম্পানিগুলোকে ওই অঞ্চল দিয়ে ওড়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিল। মালয়েশীয় ওই বিমানটির পাইলট সেই সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন কি না তা পরিষ্কার নয়। আরেকজন বিমান বিশেষজ্ঞ ডেইলি মেইলকে বলেন, অনেক এয়ারলাইন্সের মতো মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ওই রুটটি ব্যবহার করে আসছে। কারণ কম দূরত্ব। এতে জ্বালানী সাশ্রয় হয়, ফলে খরচ কম হয়। তাতে আর্থিক লাভ বেশি।