ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদ

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২২:২৩
ঈদ ঘনিয়ে এলেও দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক সংস্কার তো দূরের কথা মহাসড়ক এখন যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের একমাত্র ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর থেকে বরিশাল নগরী পর্যন্ত এখন খানাখন্দে ভরা। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এ মহাসড়কে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়। তা এখন মরণ ফাদে রূপ নিয়েছে। খানাখন্দের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। মহাসড়কের বরিশাল-ফরিদপুর অংশের ১২৪ কিলোমিটার এলাকার এখন চরম বেহাল দশা। খানাখন্দের কারণে প্রতিদিনই একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে। বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদ থেকে ভুরঘাটা বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ৪৯ কিলোমিটার মহাসড়কের অবস্থা খুবই করুণ। এরমধ্যে বরিশাল - গৌরনদী অংশের ৩০ কিলোমিটার ও ফরিদপুর- মাদারীপুর অংশের ১৫ কিলোমিটার এলাকা যানবাহন চলাচলের পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে সরু ১৮ ফুট প্রস্থের একমাত্র এ মহাসড়কে এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যানবাহন চলাচল করতে হয়। দীর্ঘ দিনের দাবি অনুযায়ী এ সড়ক প্রশস্ত করা তো দূরের কথা পূর্বের অবস্থাও সংস্কার করে সচল রাখতে পারছে না সড়ক ও জনপথ বিভাগ। আর্থিক সংকটের কথা বলে ঈদ উপলক্ষেও সংস্কারের জন্য নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। মহাসড়কের পাশে কোন হার্ডশোল্ডার নেই। সফট শোল্ডারের অবস্থা খুবই করুণ, যেকোন কারণে যানবাহন সড়কের মূল অংশের পাশে নামতে গেলে তা গড়িয়ে খাদে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বেশিরভাগ এলাকায় যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও মহাসড়ক এখন যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে চালকরা জানিয়েছেন। মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হওয়া এ মহাসড়কে নিত্য দিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এ অবস্থাতেই ঈদের সময়ে হাজার-হাজার যাত্রী মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে আবার ঈদের আনন্দ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে বাধ্য হবে। একাধিক চালক জানান, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বরিশাল অংশের ৪৯ কিলোমিটার সংস্কার হয়নি। দীর্ঘদিনের সংস্কার বিহীন খানাখন্দে ভরা এ মহাসড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। অপ্রস্থ সড়ক এ কারণে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বরিশালের প্রবেশদ্বার গৌরনদী উপজেলার ভুরঘাটা বাস টার্মিনাল থেকে শুরু করে ইল্লা, বার্থী, কটকস্থল, সাউদেরখালপাড়, টরকী, গৌরনদী, আশোকাঠী, কাছেমাবাদ, মাহিলাড়া, বাটাজোর, বামরাইল, সানুহার, জয়শ্রী এবং রহমতপুর থেকে শুরু করে সাতমাইল, ক্যাডেট কলেজ, গড়িয়ারপাড়, কাশিপুর, নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তসহ ব্যাপক খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ার কথা জানিয়ে চালকরা জানান, এ সব স্থানে নিত্য দিনই একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে। সমপ্রতি সময়ে টানা বর্ষণের পর খানাখন্দ ভরাটের জন্য বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে ভাঙ্গা ইটের টুকরা ও লোকাল বালু ফেলে জোড়াতালি দেয়ার চেষ্টা করলেও তা কোন কাজে আসেনি। বৃষ্টির সাথে সাথে শত শত গাড়ি চলাচলের কারণে এ সব গর্ত আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিনিয়ে যানবাহনে যাত্রী ও ট্রাকে মালামাল পরিবহন করতে মালিকরা বাধ্য হচ্ছেন। লোকাল বাসের চালকরা জানান, জয়শ্রী থেকে রহমতপুর পর্যন্ত দুটি সেতুর ৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ব্যতীত অন্যসব অংশের গর্ত মেরামতে ইটের সুরকি কিংবা বালু ফেলাও হয়নি। যদিও বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগ দাবি করেছে তারা ঈদকে সামনে রেখে গত সপ্তাহে ছোট-বড় গর্ত ইট ও বালু দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় তারা সড়ক সংস্কারে পদক্ষেপ নিতে পারছেন না বলে স্বীকার করেন প্রকৌশলীরা। বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬০-৬৫ সালে মাত্র ১২ ফুট চওড়া করে নির্মিত বরিশাল-ফরিদপুর মহাসড়কটি ১৯৮৮ সালের বন্যার পর দুই পাশে তিন ফুট করে মোট ছয় ফুট হার্ড শোল্ডার নির্মাণ করা হয়। পরে তা কাপের্টিং করে মহাসড়কের মূল অংশটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হয়। ১৯৯৮ সালে সড়কটি প্রসস্ত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়িত হয়নি। সেই পুরনো আমলের সড়কে ৫ টন পণ্য পরিবহন যোগ্য যানবাহন চলাচলের ক্ষমতা না থাকলেও ৩৫ থেকে ৪৫ টন পণ্য নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ফলে খুব দ্রুত সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগের তুলনায় যানবাহন চলাচলের সংখ্যা বাড়লেও সড়কের প্রস্থ বাড়েনি। বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে দু’বছর পূর্বে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বরিশাল-ফরিদপুর অংশে চার লেনে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে সমীক্ষার কাজ শুরু হয়। কিন্তু তার অগ্রগতি খুব একটা সন্তোষজনক নয়। সড়কটির ভুরঘাটা থেকে মোস্তফাপুর হয়ে টেকেরহাট পর্যন্ত ২৪ ফুট প্রস্থ করা হয়েছিল। টেকেরহাট থেকে ভাঙ্গা হয়ে ফরিদপুর পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়কের বেশির ভাগই মাত্র ১৮ ফুট প্রস্থ থেকে গেছে। সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করাসহ আপতকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জরুরী টেকসই মেরামতের পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তী নতুন সড়ক নির্মাণ করা ছাড়া আর কোন বিকল্প উপায় থাকবে না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ খালিদ শাহেদ জানান, অধিক ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বর্ষার কারণে বিটুমিন দিয়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্ষা কমলে খুব শিগগিরই ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সাময়িকভাবে সংস্কার করা হবে। বরিশাল বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব হোসেন জানান, বর্ষাকালের দোহাই দিয়ে ঈদের আগে মহাসড়কের সংস্কার করা না হলে যাত্রীদের যেমন ঈদযাত্রা কষ্টের হবে, তেমনি লোকসান গুণতে হবে পরিবহন মালিকদের। পাশাপাশি যাত্রীসহ শ্রমিকদের জীবনের চরম ঝুঁকি রয়েছে। সড়ক বিভাগ চুপ থাকলে ঈদের পূর্বেই তারা ধর্মঘটে যাবেন বলে আফতাব হোসেন জানান। তিনি বলেন অচল এ সড়কে ঢাকা-বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দ্বিগুণ- তিনগুণ সময় লাগে। তারপরও দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না।