বিএনপি গণতন্ত্র ও নির্বাচনে বিশ্বাস করে না :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৪, ২২:৩৬
বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে আন্দোলনের নামে যারা নিষ্ঠুরভাবে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, শত শত কোরআন শরিফ পোড়ানো, মসজিদে আগুন দেয়া ও হাজার হাজার বৃক্ষ নিধনসহ সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে তারা গণতন্ত্র ও নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, তারা (বিএনপি-জামায়াত) ক্ষমতায় থাকতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করেছে, দুর্নীতি-দুঃশাসন আর নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে। তিনি বলেন, এখন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের মানুষ মুক্ত পরিবেশে শান্তি ও স্বস্তিতে আছে। দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। এই অগ্রযাত্রা কেউ রোধ করতে পারবে না। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ইফতার মাহফিল-পূর্ব সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবাদপত্র হলো সমাজের দর্পণ। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া গণমাধ্যমও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই। আপনারা (সাংবাদিক) সরকারের সমালোচনা করুন তাতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু দেশের উন্নয়ন কাজের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় কিংবা বিদেশে দেশের বদনাম হয় এমন কাজ করবেন না। বেসরকারি টিভি চ্যানেলে মধ্যরাতের টকশো’র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টকশো যে কত টক এটা টেলিভিশন না দেখলে বোঝা যাবে না। এসব টকশোতে প্রশংসা তো দূরের কথা, যা বলা হয় তা আমরা যারা ভুক্তভোগী তারা ভাল করেই উপলব্ধি করতে পারি। টকশোতে টক-ঝাল-মিষ্টি সমালোচনা হলেও হতো। কিন্তু মিষ্টির পরিবর্তে টকশ’তে যা বলা হয় তা যেন বাঘা তেঁতুলের চেয়েও টক। তবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ছাড়া কোন দেশ বা সমাজের উন্নতি যে হয় না তা মনে রাখার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে আগে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলও ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেই বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি টিভি চ্যানেল ৩২টি। এছাড়া কমিউনিটি রেডিও চালু করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রমজানে গীবত করতে চাই না। রোজা মুখে কারো গীবত করা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের গীবত শুনতে হয়। প্রতিদিন ইফতার পার্টির নামে তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে নানা গীবত গাইছে, মিথ্যাচার করছে। তবে আমরা সেই মিথ্যাচারের জবাব দিতে পারি। কিন্তু ইফতার পার্টিতে আমরা কোন কথা বলি না, শুধু শুনি। আজ সাংবাদিকরা দু’টি কথা বলার সুযোগ দিয়েছে বলেই বলছি। কিন্তু আমার ইফতার পার্টিতে একটি কথাও বলি না। আমাদের প্রতিদিনই এমন গীবত শুনতে হয়। ইফতার পার্টিতে গীবত শুনে মনে হয়, জানি না তাঁরা রোজা রাখেন কিনা। কারণ রোজা রেখে এমন মিথ্যাচার তারা কিভাবে করেন? সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সাংবাদিকদের সমিতির মাধ্যমে আমরা আবাসনের জন্য জায়গা বরাদ্দের চেষ্টা করবো। কিন্তু সাংবাদিক নেতাদের দৃষ্টি রাখতে হবে, শুধু রাজধানীতে থাকা সাংবাদিকরা নন, গ্রামাঞ্চলের সাংবাদিকরাও যেন সুযোগ-সুবিধাটুকু পায়। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে আমি উপজেলাভিত্তিক পরিকল্পিত নগরায়নের কথা বলেছি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে দেশকে আমরা সবদিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। মন্দা মোকাবেলা করে দেশের অর্থনীতিকে মজবুত ও গতিশীল করেছি, প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপর রাখতে সক্ষম হয়েছি। মুদ্রাস্ফীতি ১৩ ভাগ থেকে ৯ ভাগে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি বাস্তবায়ন ৯৬ ভাগের বেশি। অতীতে কোন সরকার তা করতে পারেনি। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ ২১ বিলিয়ন ডলার। বাজেট তিনগুণ বৃদ্ধি করেছি। যার সিংহভাগ অর্থ আমরা নিজস্ব অর্থে বাস্তবায়ন করছি। কারণ আমরা বিদেশ থেকে ভিক্ষা বা অনুদান নিয়ে চলতে চাই না, আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। সকল অন্তরায় মোকাবেলা করে নিজস্ব অর্থায়নে আমরা পদ্মা সেতুও নির্মাণ করছি। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুত্ সেক্টরে তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ৫ বছর এবং তত্ত্বাবধায়কের দুই বছর মিলিয়ে এই সাত বছর বিদ্যুত্ উত্পাদন না করে বরং কমিয়ে দিয়ে যায়। আমরা ক্ষমতায় আসার পর মাত্র ৫ বছরে ১১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দেশের চাহিদা অনুযায়ী এখন বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে সক্ষম হচ্ছি। এটা আমাদের বিশাল অর্জন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আমলে শিক্ষাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সারাদেশে ৩১ কোটি বই বিনামূল্যে আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বিতরণ করছি। এক লাখ ৩৩ হাজার মেয়েকে আমরা বৃত্তি দিচ্ছি। সরকারের ব্যাপক পদক্ষেপের ফলে এখন পাসের হার ৯২ ভাগে উন্নীত হয়েছে। এই হারকে ৯৮ ভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা চাই সবাই শিক্ষিত হোক। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এদেশে হত্যা-ক্যু ও সংবিধান লংঘন করে ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সামরিক স্বৈরাচাররা অবৈধ ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে হত্যা-ক্যুর পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতি, ঋণখেলাপী, যুব সমাজের হাতে অস্ত্র ও মাদক তুলে দিয়ে বিপথে ঠেলে দেয়ার সংস্কৃতি চালু করে। আমরা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে গণতন্ত্র অর্জন করেছি। সবাই মিলে এই অর্জনকে ধরে রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মানুষের আয়-রোজগার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু আয়ও আমরা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। সাংবাদিকদের কল্যাণে কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা সাংবাদিকদের জন্য বেতন রোয়েদাদ ঘোষণা করেছি। অতীতে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের কারণে দায়েরকৃত মামলায় সাংবাদিকদের গ্রেফতারের বিধান ছিল। আমরা আইন সংশোধন করে গ্রেফতারের বদলে সমন জারির বিধান করেছি। এতে সাংবাদিকদের মর্যাদা অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, বিএফইউজে’র মহাসচিব আবদুল জলিল ভুঁইয়া, ডিইউজে’র সভাপতি আলতাফ মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ। ইফতার মাহফিলে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ সহস্রাধিক সাংবাদিক অংশ নেন। ইফতারের আগে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এছাড়া মোনাজাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদ, শহীদ চার জাতীয় নেতা এবং ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব অধ্যাপক মাওলানা ড. সালাহউদ্দিন আহম্মেদ। ইফতারের পরে প্রধানমন্ত্রী প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন।