রাজধানীতে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন গিয়াস উদ্দিন ওরফে আপন (২৮) নামে এক যুবক। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে হাতিরঝিল (বাড্ডা অংশে) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আপনের বাবার নাম আব্দুল মালেক ওরফে রুহুল আমিন। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানার পূর্ব চাঁনপুরে।
পুলিশ জানিয়েছে, আপন পেশাদার ছিনতাইকারী। এছাড়া সে গত ৩ জুলাই উত্তরায় নিরাপত্তা কর্মী লিটনকে খুন করে এক কলেজ ছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের মামলার প্রধান আসামি। তার বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অস্ত্রসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। ডিবি পুলিশ ইতিপূর্বে তাকে একাধিকবার গ্রেফতার করেছিল। তবে স্বামী নির্দোষ দাবি করে আপনের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার জানিয়েছেন, আপন মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার কথা তিনি শোনেননি।
ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ জানায়, তাদের একটি টিম রাতে গুলশান এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিল। এসময় গোপন সংবাদের মাধ্যমে তারা জানতে পারে মহাখালী এলাকায় একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার যোগে কয়েকজন দুর্বৃত্ত ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ অবস্থায় ডিবি পুলিশের আরও একটি টিম তাদের ধরতে অভিযান শুরু করে। যৌথ টিমের তাড়া খেয়ে রাত সোয়া তিনটার দিকে তারা হাতিরঝিল এলাকায় প্রথম লেনের পাশে গাড়ি থামাতে বাধ্য হয়। এরপর তারা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। এ সময় একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, দু’জন পালিয়ে যায়। হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, ২ রাউন্ড তাজা গুলি, ৩ রাউন্ড গুলির খোসা ও ৩টি মোবাইল ফোন এবং ছিনতাই কাজে ব্যবহূত একটি সাদা রংয়ের প্রিমিও প্রাইভেটকার উদ্ধার করে ।
ডিবি’র উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার নিশারুল আরিফ জানিয়েছেন, উত্তরার নিরাপত্তা কর্মী লিটন হত্যায় এবং কলেজ ছাত্রী অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় আপন জড়িত ছিল। আপনই ওই কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। ওই ভিকটিম (কলেজ ছাত্রী) গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে তাকে শনাক্ত করেছেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, অপহূত কলেজ ছাত্রী উদ্ধারের পর পুলিশকে জানায়, তাকে অপহরণ করে প্রাইভেটকারে করে নিয়ে যাওয়া হয় কালিগঞ্জে। সেখানে তাকে দু’জনের পাহারায় রেখে (হাত-পা, মুখ, বাঁধা অবস্থায়) আপনসহ দুইজন একটি বাড়িতে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর তারা ফিরে আসে। এরপর আবার প্রাইভেটকার ঢাকার দিকে যেতে থাকে। পথে গাড়ি থেকে নামিয়ে আপন তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে তাকে গাড়িতে করে উত্তরা এলাকায় নামিয়ে দেয়। এরপরই পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
সূত্র জানায়, ওই কলেজ ছাত্রীর বর্ণনানুয়ায়ী পুলিশ কালিগঞ্জের ঐ বাড়িটি শনাক্ত করে এবং পুলিশ নিশ্চিত হয় এটি পেশাদার ছিনতাইকারী সাগরের বাড়ি। ছিনতাইকারী সাগর বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে সাগরের মা ও তার এক বোনকে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেন, ঘটনার দিন রাতে তাদের বাসায় টাকা দিতে এসেছিল আপন ও তার এক সহযোগী। এরপরই পুলিশ আপনকে গ্রেফতারে অভিযান শুরু করে।
সূত্র আরও জানায়, ছিনতাইকারী সাগরের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিল আপন। সাগর গ্রেফতার হওয়ার পর তার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করতো আপন।
তবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম জানান, আপনকে আগে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে তার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছিল যে, সে-ই উত্তরার ঘটনা ঘটিয়েছে।
নিহত আপনের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার গতকাল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে সাংবাদিকদের জানান, টেলিভিশনের খবর দেখে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। স্বামী সম্পর্কে তিনি জানান, আপন এলাকায় মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার তিনটি মাছের ঘের রয়েছে। তিন দিন আগে ব্যক্তিগত কাজে আপন ঢাকায় আসেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়। কথা বলার এক পর্যায় কে যেন আপনের কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। এরপর থেকে আপনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
আপনকে নির্দোষ দাবি করে ইয়াসমিন আক্তার জানান, পাঁচ বছর আগে তার সঙ্গে বিয়ে হয়। আর চার বছর আগে তারা রাজধানীর মিডফোর্ট এলাকায় থাকতেন। ওই সময় আপন গ্যারেজে কাজ করতেন ও গাড়ি চালাতেন।
প্রসঙ্গত, গত ৩ জুলাই রাত ১১টার দিকে উত্তরার চার নম্বর সেক্টর থেকে অপহূত হন এক কলেজ ছাত্রী। এসময় বাধা দিতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন নিরাপত্তাকর্মী লিয়াকত হোসেন লিটন। এ ঘটনায় কলেজ ছাত্রীর মা বাদী হয়ে উত্তরা মডেল থানায় মামলা করেন।
