হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী অন্যতম এই প্রাণীটি
বিলুপ্ত প্রায় প্রাণিগুলোর মধ্যে সজারু একটি। মেহেরপুরে আগের মত এখন আর এ প্রাণিটি চোখে পড়ে না। রাতের আঁধারে ঝুমঝুম শব্দ আর মানকচু খাওয়ার শব্দ সজারু উপস্থিতি স্মরণ করে দিত। সবজি ও ছোট ছোট গাছ খেয়ে এরা জীবন ধারণ করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা কম নয়।
মেহেরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও বিএম কলেজের প্রভাষক আসকার আলী বলেন, আশির দশকের শেষের দিকে তার এলাকা মেহেরপুর সদর উপজেলার নূরপূর গ্রামে সজারুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। মানকচু ও মাটির তলার আলু খেয়ে এরা ক্ষেত নষ্ট করতো। গ্রামের বাঁশ ঝাড়ের মুড়োর মধ্যে গর্ত করে বাস করতো এরা। তিনি আরো বলেন, মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান এলাকার কেউ কেউ নূরপুর গ্রামের বাঁশ ঝাড়ের নিচের মাটি খুঁড়ে সজারু ধরে নিয়ে যেত। তারা সজারুর মাংস খেত। এখন সজারু চোখে পড়ে না আর তাই কেউ সজারু ধরতে আসে না।
খুলনা সরকারি ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএল কলেজ) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ড. একেএম নজরুল কবীর বলেন, সজারুর ইংরেজি নাম Indian Crested Porcupine এবং বৈজ্ঞানিক নাম Hystrix indica। এরা দেশি সজারু বা ভারতীয় সজারু নামে পরিচিত। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশে সজারু দেখা যায়। পাহাড়-পর্বত, উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের সমতল ভূমি ও বনাঞ্চলে সজারু দেখা যায়।
তিনি বলেন, দেশি সজারু ৩ ফুট বা তার বেশি লম্বা হয়ে থাকে। পূর্ণ বয়স্ক সজারুর ওজন সাড়ে ১৪ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের দেহে কয়েক স্তর বিশিষ্ট শক্তিশালী, ধারালো ও তীক্ষ ধারালো কাঁটা রয়েছে। দীর্ঘতম কাঁটাটি কাঁধের দিকে জন্মায় এবং এর দৈর্ঘ দেহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়ে থাকে। এর লেজও ছোট কাঁটার আবরণে পূর্ণ যা এরা আত্মরক্ষার্থে ব্যবহার করে থাকে ও আলোর বিচ্ছুরণ ঘটনায়। এর বিস্তৃত পা ও লম্বা থাবা রয়েছে। সজারু যখন আক্রমনের শিকার হয় তখন তার দেহস্থ কাঁটাগুলো সক্রিয় হয় ও লেজ থেকে খসে গিয়ে শিকারীকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করে। এদের বিষাক্ত কাঁটা শিকারীর গায়ে বিদ্ধ হলে ঐ ব্যক্তি গুরুতর আহত এমনকি তার মৃত্যুও হতে পারে।
স্ত্রী সজারু ২৫ মাস ও পুরুষ সজারু ২৯ মাস বয়সে যৌবন প্রাপ্ত হয়ে থাকে। স্ত্রী সজারুর গর্ভধারণকাল ২১০ দিন। এরা বছরে এক থেকে ৪টি পর্যন্ত শাবক প্রসব করে। নিশাচর প্রাণি হিসেবে দেশি সজারু দিনের বেলা মাটির নিচে আশ্রয় নেয়। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে এরা বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলে। সজারু ঘাস, লতা-পাতা ও ছোট ছোট গাছ খেয়ে জীবন ধারণ করে। তবে ক্ষুধা মেটাতে এরা ফলমূল, শস্য, গাছের শিকড় পর্যন্ত খেয়ে ফেলে।
মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ডা. শশাংক কুমার মন্ডল বলেন, সজারু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই বিপন্ন প্রায় প্রাণিটি রক্ষার্থে আমাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত।
