জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার নুহাশ পল্লীতে কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং ইফতারের আয়োজন করা হয়। নুহাশ পল্লীর আশপাশের মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্র, পরিবারের সদস্য এবং হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ট বন্ধু, লেখক, প্রকাশকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৫ শতাধিক লোক ইফতার মাহফিলে যোগ দেন। সকাল থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্ররা কোরআন তেলোয়াত করেন। ইফতারের পূর্বে তারা কবর জিয়ারত করে মোনাজাত শেষে মিলাদ মাহফিলে অংশ নেন।
হুামায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের মা, ভাই, বোন, প্রথম পক্ষের কোন সন্তানকে এবং হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট শিল্পী, অভিনেতাদের উপস্থিত হতে দেখা যায়নি। তবে কয়েকদিন পূর্বে বড় ছেলে নুহাশ আহমেদ, মেয়ে শিলা আহমেদ, নোভা আহমেদ নুহাশ পল্লী এসে তার বাবার কবর জিয়ারত করে গেছেন বলে জানান নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বুলবুল। গতকাল শনিবার বেলা ১২টার দিকে হুমায়ূন পত্নী মেহের আফরোজ শাওন তার দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত, শাওনের পিতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী, মা সাবেক এমপি তহুরা আলী, হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ট বন্ধু ড. মোঃ করিম, মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থী, শতাধিক হিমুভক্ত অসংখ্য মানুষ নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের কবরে পুষ্প স্তবক অর্পণ করেন। তারা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে দোয়া-দরুদ পাঠ করেন। হুমায়ূন আহমেদের আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করেন। মোনাজাত পরিচালনা করেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ মোঃ মজিবুর রহমান।
গতকাল সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে হুমায়ূনভক্তরা নুহাশ পল্লীতে আসতে থাকেন। তারা তাদের প্রিয় লেখকের কবরে পুষ্প স্তবক অর্পণ এবং কবর জিয়ারত করেন। দুপুরের পর নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের কবর জিয়ারত করতে আসেন দর্শনার্থী, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী। হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ট কয়েকজন বন্ধু, লেখক, নাট্যকার, প্রকাশক, অধ্যাপক, অভিনেতা তার কবর জিয়ারত করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ট বন্ধু ড. মোঃ করিম, ‘অন্য প্রকাশে’র স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, অবসর প্রকাশনীর আলমগীর হোসেন, সময় প্রকাশনীর ফরিদ হোসেন, অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ, কাকলী প্রকাশনীর নাসির আহমেদ সেলিম, অন্তেষণা প্রকাশনীর মোঃ শাহাদাত্ হোসেন। জিয়ারত শেষে হুমায়ূন পত্নী মেহের আফরোজ শাওন সাংবাদিকদের কাছে স্মৃতিচারণ করে জানান, সবসময় তার মাঝে হুমায়ূন আহমেদের শূন্যতা বিরাজ করে। হুমায়ূন আহমেদবিহীন প্রতিটি দিনই হচ্ছে ১৯ জুলাই। আজকের দিন আর অন্যদিনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। প্রতিটি দিন ও মুহূর্তই আমার কাছে একই রকম। হুমায়ূন আহমেদকে কেবল একটি দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরই তাকে নিয়ে রিপোর্ট করা যায়। শাওন বলেন, হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন ছিল একটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। তার সে ইচ্ছা পূরণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যে কোন সময় ঘোষণা করা হবে কখন নির্মাণ শুরু হবে ক্যান্সার হাসপাতাল। তিনি জানান, নুহাশ পল্লীকে আরো ভালভাবে চালাতে চাই। তাই এটাকে নিয়ে আমরা ট্রাস্ট্রি বোর্ড করতে চাই। এ জন্য আমি চেষ্টা চালাচ্ছি। সবার সঙ্গে যোগাযোগও করছি। এ বোর্ডে হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ ছাড়াও ভাইদের মধ্যে একজন, নুহাশ-শিলাদের মধ্যে একজন এবং নিশাত-নিনিতদের মধ্যে একজন করে সদস্য থাকবে। তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ শুধু আমার স্বামীই নন, তিনি আমার নাট্যগুরু ও গানের গুরু ছিলেন।
কবর জিয়ারত কালে হুমায়ূন আহমেদের দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত বাবার কবরের পাশে বসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
সকালে নুহাশ পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, স্বেতপাথরে বাঁধানো হুমায়ূন আহমেদের কবরটির চারপাশে দেয়াল ও স্বচ্ছ কাঁচ লাগিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রিয় লেখকের স্বপ্নকে তিনি যেভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন তার আলোকে সেভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হচ্ছে নুহাশ পল্লীকে। হুমায়ূন আহমেদের সমাধির উত্তর পাশে মাথার কাছে কাঁচের দেয়ালে তার লেখা দুটি পংক্তি রয়েছে। তাতে লেখা আছেঃ কল্পনায় দেখছি, নুহাশ পল্লীর সবুজের মধ্যে ধবধবে শ্বেত পাথরের কবর। তার গায়ে লেখা- ‘চরণ ধরিতে দিয়োগো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে’।
দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের সদস্যরা ইফতার মাহফিল ও কোরআন খতমের মধ্য দিয়ে স্মরণ করলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিককে। শনিবার বিকেলে রাজধানীর পল্লবীতে ছোট ছেলে আহসান হাবীবের বাসায় হুমায়ূন জননী আয়েশা ফয়েজ পারিবারিকভাবে স্মরণ করলেন বড় সন্তানকে। পুত্রের পছন্দ অনুযায়ীই হলো স্মরণের অনুষ্ঠান- পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিলাদ মাহফিল আর ইফতার। মা আয়েশা ফয়েজ ছাড়াও লেখকের দুই ভাই ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবিব, তিন বোন সুফিয়া হায়দার শেফু, মমতাজ শহিদ শিখু, রোকসানা আহমেদ ভাইয়ের জন্য দোয়ায় অংশ নেন। হুমায়ূন আহমেদের ভাইদের স্ত্রী, বোনদের স্বামী, মামা, খালা, তাদের ছেলেমেয়েসহ পরিবারের প্রায় সবাই ছিলেন দোয়া অনুষ্ঠানে। প্রকাশকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ, অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ, কাকলী প্রকাশনীর একেএম নাছির আহমেদ সেলিম, পার্ল পাবলিকেশন্সের হাসান জায়েদী, আফসার ব্রাদ্রার্সের আলমগীর হোসেন, তাম্রলিপির তারিকুল ইসলাম রনি প্রমুখ। তবে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খান ও তিন মেয়ে ও এক ছেলের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। আহসান হাবীব জানান, হুমায়ূন আহমেদকে হারানোর পর এখনও শোকাতুর তাদের পরিবার। পুত্র হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠতে পারেননি বৃদ্ধা মা আয়েশা ফয়েজ। ছেলের মৃত্যুদিনে কোরানখানির ব্যবস্থা করেছেন। এতিমখানায় খাবার পাঠিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও বাবার মৃত্যুদিনটি এমনভাবেই পালন করতেন। ‘ভাইয়ের কথা এখনও মনে পড়ে। সবসময়ই তাকে আমরা স্মরণ করি। এজন্যই আনুষ্ঠানিক কোন শোক বা স্মরণসভার আয়োজন করি নাই।’
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা সদরে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টায় হুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে র্যালি ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। র্যালিতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা: রুহুল আমিন। কেন্দুয়া রিপোর্টার্স ক্লাবে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন কেন্দুয়া রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন, কেন্দুয়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক বদিউজ্জামান তালুকদার বকুল, শিক্ষক অপু সরকার, সাংবাদিক লাভলু পাল মোতাহার হোসেন, আলীনূর ইসলাম, বাউল কবি ইসলাম উদ্দিন, কবি আবুল হাসেম বয়াতী, বাউলশিল্পী কাঞ্চন মিয়া, বাউল নূর মিয়া, চৌধুরী, হুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি সংসদের সভাপতি মজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান।
নেত্রকোনা হুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে গতকাল শনিবার নেত্রকোনা শহরে র্যালি ও প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদের সভাপতি তানভির জাহান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক ড. তরুণ কান্তি সিকদার। আলোচনা করেন হায়দার জাহান চৌধুরী, সংসদের সম্পাদক কামাল হোসেন এবং প্রেসক্লাব সম্পাদক এম মুখলেছুর রহমান খান।
