বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে সদ্যসমাপ্ত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে। এর আগের অর্থবছরে (২০১২-১৩) দেশটিতে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি সাড়ে ১০ শতাংশ বাড়লেও সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশেরও কম। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপ এবং কানাডা, ভারত, চীন এবং অন্যান্য নতুন বাজারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। এসব দেশে রপ্তানি বাড়ায় সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে গার্মেন্টস রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় গড়ে ১২ শতাংশ বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, নানামুখী কারণে দেশটির বাজারে দুটি সিজনের (মৌসুম) অর্ডার ধরতে ব্যর্থ হয় বেশিরভাগ বাংলাদেশি কারখানা। ফলে সেখানে গত বছরে গার্মেন্টস রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বাড়েনি। বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী ইত্তেফাককে বলেন, তাজরীন ও রানা প্লাজার ধসের জেরে দেশটির বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশি গার্মেন্টস পণ্য ক্রয় কমিয়ে দেয়।
দেশটির নেতৃত্বাধীন ক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত কারখানা পরিদর্শন টিম (অ্যালায়েন্স) পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু করতে কিছুটা সময় নেয়। অন্যদিকে কারখানায় অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আসার পর তা স্থাপনে বাড়তি সময় লেগে যায়। ততক্ষণে নিরাপত্তার অজুহাতে বড় ব্র্যান্ডগুলো অনেক কারখানা থেকে অর্ডার প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে দুটি সিজনের (মৌসুমের) অর্ডার ধরতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।
এসব কারণে দেশটিতে গার্মেন্টস রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। তিনি বলেন, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের পরিদর্শনে বেশিরভাগ কারখানার অগ্নি ও ভবনের কাঠামোগত ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ নয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে ক্রেতাদের সংশয় কেটে যাবে। আগামী ডিসেম্বরে ক্রিসমাস সিজনকে সামনে রেখে রপ্তানি আবার বাড়বে।
ইপিবি’র পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নিটওয়্যার ও ওভেন মিলিয়ে দেশটিতে ৫১৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আগের ২০১২-১৩ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫শ’ কোটি ডলার। অর্থাত্ পূর্বের অর্থবছরের তুলনায় পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। এই সময়ে নিটওয়্যার ও ওভেন রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে দুই শতাংশ ও ছয় শতাংশ হারে। এর আগের অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানি বেড়েছিল সাড়ে ১০ শতাংশ হারে।
অবশ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তাজরীন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধসের ঘটনা এবং এর জেরে দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা) স্থগিত করা হয়।
এসব ঘটনার পরও দেশটির বাজারে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে, যদিও তা আগের অর্থবছরের তুলনায় কম, তবুও রপ্তানির জন্য এটি ইতিবাচক। যুক্তরাষ্ট্র সরকার গত বছর জুন মাসে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে। মূলত তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকের প্রাণহানি, অনিরাপদ কর্ম পরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এই জিএসপি স্থগিত করা হয়।
তবে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য গার্মেন্টস এই সুবিধা পায় না। মোট রপ্তানি আয়ের এক শতাংশেরও কম জিএসপির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। তৈরি পোশাকসহ প্রায় সব পণ্য উচ্চহারে শুল্ক দিয়ে আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করে। এই শুল্কের পরিমাণ গড়ে ১৫ শতাংশ। তাই জিএসপি সুবিধা স্থগিতের আর্থিক প্রভাব গুরুত্ব বহন করে না।
