রাণী এলিজাবেথের ছেলের সাথে একই দিনে একই লগ্নে (১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর) বাংলাদেশের এক মায়ের কোল জুড়ে জন্ম নেয় এক শিশু। তার ডাকনাম রাখা হয়েছিল কাজল। কাজলের মাকে স্বামী বলেছিলেন, ‘রাণীর ছেলে বিখ্যাত হবে বাবা-মায়ের নামে আর আমাদের ছেলে বিখ্যাত হবে তার নিজের যোগ্যতায়! তুমি দেখে নিও।’
বাবার কথা সত্যি করেই কাজল একদিন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ হন। কিন্তু বাবা তা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭১ সালের ৫ মে বলেশ্বর নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে মিলিটারিরা গুলি করে মেরে ফেলে কাজলের পুলিশ অফিসার বাবাকে। সংসারে নেমে আসে বিপর্যয়। এই বিপর্যয়ে কাজল তার মার সঙ্গী হন। নিজে পড়াশোনা করেন। ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা দেখেন। একদিন বিপর্যয় কেটে যায়। তবে কাজল বেশিদিন থাকতে পারেনি পৃথিবীতে। ক্যান্সার নামের আর এক বিপর্যয় তাকে নিয়ে যায় না ফেরার দেশে। মা এখন কাজলের ছবি দেখেন, একা একা কথা বলেন, আবার সবাইকে ডেকে চুপ করে কাজলকে উপলব্ধি করতে বলেন। আর একটাই আক্ষেপ করেন, সুন্দর দিনগুলো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়!
প্রথম আদরটা প্রথম সন্তানই পায়
কাজল যখন আমার পেটে আসে, সবাই বলে ও অন্যরকম মানুষ হবে সাধারণ নয়। তখন আমি খুব অসুস্থ থাকতাম। ওর জন্মের পর সুস্থ হই। আমার বাবা এবং আমার স্বামী আমাকে বলেন এটা ওর ভাগ্যে হয়েছে। তারা নিশ্চিত এই ছেলে নিজের মেধায় অনেক বড় হবে। আমরা ওর মধ্যে অন্যরকম মেধা দেখতে পাই। যে বয়সে ও ছোট ছোট কাঁঠালগুলোকেও লিচু বানানোর জন্য ঘরে রেখে দেয়, সে বয়সে কেউ তা ভাবতেই পারে না। ও দুষ্টু ছিল কিন্তু দুষ্টুমিটাতেও মেধার ছাপ রাখতো। আমি ওকে বকতে পারতাম না। ওর বাবা আমাকে বারণ করতেন। বড় সন্তানের জন্য আদরটা অন্যরকম থাকে।
ভাল খাবারের প্রতি ছিল আগ্রহ
যে কোন খাবারই ভাল না হলে সে খেত না। ভাল রান্না করা কিংবা রান্না ছাড়া যে খাবার হয় তা মানুষ দুই এক বার যেমন তেমন খায় কিন্তু ও তা কখনই করতো না। এমনও হয়েছে আমরা দাওয়াত খেতে গেছি রান্নাটা ভাল হয়নি। ও খুব সুন্দর করে সামনেই বলে দিত, রান্নাটা ভাল করে আমাদের দাওয়াত করবে। আবার ভাল রান্না হলেও প্রশংসাটা তেমনই করতো। একা কখনই খেতে পারত না। ছেলেবেলা থেকেই সাথে সঙ্গী নিয়ে খেতে বসতো। অনেক সময় আমাদের খাবারের কম পড়ে যেত। ওটা বুঝতো না। ফলে আমি কাজলের দুই একজন বন্ধু জন্য বাড়তি রাঁধতাম। এই অভ্যাসটা শেষ অবধি ছিল।
হঠাত্ উধাও হতো
হঠাত্ হঠাত্ আমরা কাজলকে কোথাও খুঁজে পেতাম না। কোথায় যে চলে যেতো। অনেক পরে হাতে কি কি যন্ত্রপাতি নিয়ে বের হতো। আমাদের নতুন কোন ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্র বা নতুন কোন কিছু দেখলেই তার সেটা খুলে ভেতরটা দেখার সাধ ছিল। একদম নিবিড় কোন স্থানে পুরোটা খুলে আদি-অন্ত দেখেই হাতে যন্ত্রপাতি নিয়ে বের হতো।
ওদের মধ্যে সম্মানবোধ ছিল
ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা ও দেখতো। বোনরা এদিক ওদিক খেলছে, ও দেখলে বলতো কি করছিস, অঙ্ক বইটা নিয়ে এদিকে আয়। তবে ছোট ভাইবোন কাজলকে যতটা রাগী ভাবে, ততটা রাগী ও ছিল না। আমার স্বামীর পরিবারে ভাইয়ে ভাইয়ে খুব সম্মান করার প্রচলন ছিল। যেটা আমি আমার ছেলেদের মধ্যে দেখেছি। একবার এক সাংবাদিক ওদের তিন ভাইয়ের ইন্টারভিউ করতে এসেছে। ইন্টারভিউ শেষে চা নাস্তা দেয়া হলো। সাংবাদিক খেতে খেতে বললেন আপনারা দীর্ঘ সময় আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন কিন্তু এই সময়ের মধ্যে নিজেদের সাথে কোন কথা বললেন না। ওদের মধ্যে সম্মানবোধ থেকে এমন একটা দূরত্ব ছিল। আমার তিন মেয়ের মধ্যে তা ছিল না। তবে পিএইচডি করে এসে ও ভাইবোনদের সাথে কিছুটা গল্প করতে শুরু করে।
কবিতা লিখেছিল
স্কুলের ম্যাগাজিনেই সম্ভবত ওর প্রথম লেখা ছাপা হয়। বাসায় সবসময়ই ছিল অন্যরকম একটা পরিবেশ। বই পড়া, আবৃত্তি করা, গান গাওয়া ও শোনা, ছবি আঁকায় সবারই ছিল উত্সাহ। কখনো হয়ত তাদের বাবা বলতেন, পয়সা পাবি- যা একটা গল্প লিখে আন বা কবিতা লিখে আন ইত্যাদি। ‘সাহিত্য বাসর’ নামে একটি নিয়মিত আড্ডার আয়োজন করতেন ওদের বাবা। তার সংগ্রহে ছিল অনেক বই। এই পরিবেশই ছোটবেলা থেকে কাজলের মাঝে লেখার আগ্রহ, বইয়ের সাথে সখ্যতা ও সঙ্গীতপ্রীতি তৈরি হয়। শিখুকে নিয়ে দুটি কবিতা লিখে ছিল। দুটাই পত্রিকায় প্রকাশ পায়।
সুন্দর জীবনগুলো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়
ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আমার সাথে বেশি ঘনিষ্ঠতা। যেখানেই যেতো আমার সাথে কথা বলে যেতো। এসেও গল্প করতো। আমরা অনেক সাধারণ জীবন-যাপন করি। এখনও আমি তাই করি। আমাদের ঈদগুলো অনেক বেশি রঙিন ছিল না অর্থ প্রাচুর্যের দিক দিয়ে। বড়ই সাদামাটা দিন। তারপরেও অনেক আনন্দ। ওর রাগ হঠাত্ই উঠতো আবার পরেও যেতো সাথে সাথে। ছেলেবেলায় কারো সাথে ঝগড়া করলে, ঘরে ঢুকেই আমাকে বলতো মা ওকে ডেকে নিয়ে আসেন। একা থাকতে পারতো না। তারপরও একটা সময় ওকে একা থাকতে হয়েছে। সব সময় আড্ডা দিয়ে লোকজন নিয়ে থাকতে পছন্দ করতো। সুন্দর জীবনগুলো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।
ছবি :মাহমুদ জামান অভি
