তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, অবৈধ ক্ষমতা দখলের ধারাবাহিকতা থেকে দেশকে রক্ষা করতে কর্নেল তাহের ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। আর এই বিপ্লব ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তীকালে সব চাইতে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ। কিন্তু জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। দেশের সর্বোচ্চ আদালত জেনারেল জিয়াকে ঠাণ্ডা মাথার খুনি বলে অভিহিত করেছে। পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের বেঈমানী, ৭১ এ রাজাকারদের বেঈমানী, খন্দকার মোশতাকের বেঈমানীর পর জেনারেল জিয়া ছিলেন চার নম্বর বেঈমান।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মাল্টিপারপাস হলে ৩৮তম তাহের দিবস উপলক্ষে জাসদ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
হাসানুল হক ইনু বলেন, অতীতের বেঈমানদের হাত ধরে বেগম খালেদা জিয়া ৭১, ৭৫ এবং ২১ আগস্টের খুনিদের নিয়ে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করছেন। তিনি বলেন, মোশতাক-জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। সেই অন্ধকার থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য জাসদ রাজপথের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
জাসদ কখনো মিথ্যাচার করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাসদ কোন কিছু গোপনে করেনি, যা করেছে প্রকাশ্যে করেছে। যা সত্য তাই করেছে। তাই এবার আর কোন দেশপ্রেমিক ফাঁসিতে ঝুলবে না, এবার ফাঁসি হবে চক্রান্তকারীদের।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, শুরু থেকেই জাসদকে আতুরঘরে ধ্বংস করার যে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত হয়েছিল আজও সেই চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, ধাক্কাধাক্কি করে বা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের মাধ্যমে জাসদকে ধ্বংস করা যাবে না। বরং জাসদ আরো শক্তিশালী হয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, জিয়ার মাজার দেশ ও গণতন্ত্র বিরোধী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রকারীদের তীর্থকেন্দ্র। এই মাজারকে কেন্দ্র করেই বেগম জিয়ার নেতৃত্বে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পরিচালিত হয়। তিনি জিয়ার মাজার ঢাকা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করার দাবি জানান।
আলোচনা সভায় জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দিন খান বাদল এমপি, স্থায়ী কমিটির সদস্য শিরীন আখতার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, মিসেস লুত্ফা তাহের, সহ-সভাপতি মীর হোসাইন আখতার, প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান, হাবিবুর রহমান শওকত প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শীর্ষক আলোচনা সভা
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটোরিয়ায় শহীদ কর্নেল তাহের-এর ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দীর্ঘসূত্রিতার বিপদ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে কর্নেল তাহের সংসদ। আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবো, সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ করবো, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে দূরে রাখবো। যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ আছেন তারা আমাদের পরামর্শ দিবেন। আমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেন।’
তিনি বলেন, অনেকে বলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিলম্বিত হওয়ার কারণে এখন দেশে খারাপ সময় চলছে। আমি বলবো, এখন কোন খারাপ সময় নয়, ভালো সময় চলছে। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য এগিয়ে চলছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশের অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রকে অক্ষুণ্ন রাখতে যতদ্রুত সম্ভব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য শেষ করতে হবে। ট্রাইবুনাল ও প্রশাসন দিয়ে এ বিচারকার্য শেষ করা সম্ভব না। জনগণের ঐক্যই পারে এ বিচারকার্য শেষ করতে। জনগণের এই ঐক্য শুধু সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। মাঠ পর্যায়েও এই ঐক্য থাকতে হবে।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন বলেন, দেশে আজ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলছে। সমাজ ও রাষ্ট্র দু’ভাগে বিভক্ত। এতে করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে আইনমন্ত্রীকে আরও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে এবং ট্রাইব্যুনালকে শক্তিশালী হতে হবে।
কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি একসাথে ক্ষমতায় এবং বিরোধীদলে থাকলে এই বিচার কার্য সম্পন্ন করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, সরকারের সদিচ্ছা নয় জনগণের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে এই বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে।
আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, শহীদ কর্নেল তাহেরের সহধর্মিনী লুত্ফা তাহের প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। গণতান্ত্রিক এ সমাজে সবাইকে এ বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
