এলো খুশির ঈদ এলো

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪২
একটি বছর পর আমাদের সামনে আবার এলো ঈদ—ঈদুল ফিতর। ঈদ মানে খুশি। আনন্দ-উত্সব। আর ফিতর মানে রোজা ছাড়া। সব মিলে রোজা ছাড়া বা রোজা শেষের উত্সব। ঈদ উপলক্ষে সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঘরে ঘরে খুশির ঢেউ বয়ে যায়। পৃথিবীর যে অঞ্চলেই মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস, সর্বত্রই এই উত্সব পালিত হয় মহাসমারোহে। ঈদুল ফিতর বা রোজা শেষের উত্সব বিভিন্ন দেশের ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। মজার আর বাহারি সেসব নাম। যেমন: বাংলা ভাষায় রোজার ঈদ— ঈদুল ফিতরও বলা হয়; আরবি ভাষায় ঈদ-আল ফিতর; ইন্দোনেশীয় ভাষায় ইদুল ফিতরি, হারি লেবারান; মালয় ভাষায় হারি রায়া আইদিল ফিতরি, হারি রায়া পুয়াসা, হারি লেবারান; ভারতের তামিল ভাষায় নোনবু পেরুনাল; জাভা ভাষায় নগাইদুল ফিতরি; সুদানী ভাষায় বোবোরান সিয়াম; আজাবাইজানে রামাজান বায়রামী, ওরুক্লুক বায়রামী; তাতার ভাষায় উরাজা বায়রাম; কিরগিজ ভাষায় ওরোজো মায়রাম; তুর্কি ভাষায় রামাজান বায়রামি; চীনের উইঘুর ভাষায় রোজি হেইত; সেনেগালের ভাষায় কোরিটে; ফারসি ভাষায় ঈদ-এ-সাঈদ-এ ফিতর; উর্দু ভাষায় ছোটি ঈদ, মিঠি ঈদ; সিন্ধী ভাষায় ঈদ নিমাজ; মালায়ালম ভাষায় চেরিয়া পেরুনাল; আলবেনীয় ভাষায় বাজরাম; সোমালী ভাষায় চীদ ইয়ার; বসনিয়ান ভাষায় রামাজানস্কি বাজরাম; স্প্যানিশ ভাষায় ফিয়েস্তা ডি লা রুপতুরা ডেল আইয়ুনো; ইথিওপিয়ান ভাষায় ইদ আল-ফাতের; ডাচ ভাষায় সুইকারফিস্ট, চীনা ভাষায় কাইঝাই ডি শেনজিয়ান ইত্যাদি আরো কত কত নাম। তবে নাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য অভিন্ন— আনন্দ আর খুশির বন্যায় ভেসে যাওয়া এবং সমাজের দুস্থ-দরিদ্র-অসহায়দের সেই আনন্দে শরিক করার চেষ্টা করা। পৃথিবীর সব উত্সব-আনন্দের প্রচলন মানুষের মনের তাগিদে। বৈচিত্র্যের মাঝে একাত্ম হয়ে ভিন্ন কিছু পাওয়ার আশায়। কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবে এমনই এক প্রাণী, যে শুধু পেট পুরে খেয়ে আরাম-আয়েশে সময় পার করতে পারে না। তার মধ্যে আছে বিশেষ এক অনুভূতি বা বোধ, যার আকর্ষণে সে চায় বৈচিত্র্য, আনন্দ আর বিনোদন; নিজের মনকে রাঙিয়ে নেয়ার উপলক্ষ। আর এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জাতি- গোষ্ঠীর মধ্যে নানা রকম উত্সব-অনুষ্ঠান এবং আনন্দ-বিনোদনের প্রচলন। বৈচিত্র্য আর বিনোদনপিয়াসী মানুষই এসব উত্সবের স্রষ্টা। মুসলমানদের ঈদ উত্সব পালনের একটা ইতিহাস আছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) মদিনায় হিজরত করার পর বুঝতে পারছিলেন, একটু বৈচিত্র্য, একটু নির্মল আনন্দ মুসলমানদের জন্য খুবই দরকার। তিনি ছিলেন অত্যন্ত্ম তীক্ষ্ন বুদ্ধিসম্পন্ন এক সুরুচিবান মানুষ। আরবের প্রচলিত আনন্দ-উত্সবগুলো ছিলো অশ্লীল ও অপসংস্কৃতিতে ভরা। রুচির মানদণ্ডে সেগুলো মুসলমানদের জন্য উপযুক্ত ছিলো না বলেই বিকল্প আনন্দ-উত্সবের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন তিনি। এদিকে হিজরি দ্বিতীয় সাল অর্থাত্ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে মক্কার অবিশ্বাসীদের সঙ্গে মদিনার মুসলমানদের এক ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার নাম বদর যুদ্ধ। মাত্র ৩১৩ জন সৈন্য নিয়ে মুসলমানরা ১ হাজার সৈন্যের শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং বিজয়ী হন, যা ছিলো রাসূল (স.) ও তাঁর সাহাবীদের (সঙ্গীদের) জন্য এক মহা আনন্দের উপলক্ষ। এ ছাড়া, রাসূল (স.) তার মেয়ে ফাতিমার (রা.) বিয়ে দেন হযরত আলীর (রা.) সঙ্গে— এটিও এক পরম আনন্দের ঘটনা। এমন আনন্দের ঘটনার সাক্ষী যে রমজান মাস, তার শেষ দিন এলো। এ দুটি আনন্দের উপলক্ষ এবং মুসলমানদের নির্মল আনন্দ-বিনোদনের দিকটি বিবেচনা করে মহানবী (স.) ঘোষণা করলেন, আগামী কাল ঈদ— ঈদুল ফিতর। রোজাশেষের খুশির উত্সব। এভাবেই ঈদুল ফিতর বা রোজাছাড়ার উত্সবের শুরু, যা আজও চালু রয়েছে সারা বিশ্বে। রমজান মাসে দীর্ঘ ত্রিশটি দিন রোজা পালন খুবই কঠিন কাজ— এটি ফরজ বা অবশ্যকরণীয় ইবাদত। সারাদিন খাওয়া নেই, পানি পান করা নেই। পরম ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রোজাদার রোজা পালন করেন। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও অনেকে রোজা রাখে। এই কষ্টকর ইবাদতের জন্য রোজাদারের পুরস্কার আল্লাহ নিজেই দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। এটি রোজাদারদের জন্য বিশেষ সুখবর, খুশির কথা। এমন খুশির উপলক্ষ যে রোজা তার সমাপ্তিতে উত্সব-আনন্দের জোয়ার বয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। ঈদের দিনে আমরা নতুন নতুন জামাকাপড়, জুতো পরি। সুগন্ধি মাখি। কিছু মিষ্টিমুখ করে বড়দের সঙ্গে ঈদগাহে যাই। জামাতে ঈদের নামাজ পড়ি। এই নামাজ কিন্তু একটু ভিন্ন প্রকৃতির। দুই রাকাত নামাজ খোলা ময়দানে পড়তে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে মসজিদেও পড়া যায়। অতিরিক্ত ছয় তাকবির সহকারে ইমামের পিছনে ঈদের নামাজ পড়ার রীতি। নামাজশেষে শব্দ করে পড়ি— ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু; আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ।’ অর্থাত্—‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ; আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সব প্রশংসা তাঁরই।’ তারপর একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করি। এরপর বাড়িতে ফিরে আমরা নানা রকম সুস্বাদু খাবার খাই। বিকেলে বা সন্ধ্যায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাই। বড়রা মৃত স্বজনদের কবর জিয়ারত করেন, তাদের জন্য দোয়া করেন। ঈদে আর কি কি করা হয়? ওঃ হ্যাঁ, বলতে ভুলেই গেছি— ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে একটি জরুরি কাজ করতে হয়— বড়রাই করেন কাজটি, তাহলো ফিতরা প্রদান। ফিতরা হলো গরিব-দুস্থ-অসহায়দের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের দান, যা বিত্তবানদের জন্য অবশ্যপালনীয়। এই দানের সামগ্রী হলো প্রধান খাদ্যশস্য— আমাদের দেশে চাল বা গম। ফিতরা হিসেবে মাথাপিছু কমপক্ষে ৩ সের ৯ ছটাক চাল অথবা গম কিংবা সমপরিমাণ টাকা দিতে হয়। আমাদের দেশে অবশ্য বেশিরভাগ মানুষ ফিতরা হিসেবে টাকাই দেয়। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ঈদের আনন্দ একেবারেই একতরফা নয়। নিজে পেট ভরে খেলাম, ভালো ভালো জামাকাপড় পরে ফুর্তি করে বেড়ালাম, গরিব-দুঃখী অভাবীদের দিকে ফিরেও তাকালাম না— এধরনের আনন্দ প্রকৃত আনন্দ নয়। ধনী-গরিব সবাই মিলে আনন্দ করতে পারার মধ্যেই তো প্রকৃত আনন্দ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটি বলেছেন: ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ/ ও তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/ শোন্ আসমানি তাকিদ/ তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ/ দে জাকাত মুর্দা মুসলিমে আজ ভাঙাইতে নিঁদ।’ ঈদুল ফিতর এই প্রেরণাকে শাণিত করার মহিমান্বিত দিন। একটি আনন্দময় উত্সব। ভ্রাতৃত্ব, সাম্য আর মানবতার বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আসে ঈদুল ফিতর। ঈদ আসে আনন্দ আর খুশির ডালি নিয়ে; কিন্তু সে আনন্দ একার নয়, সকলের। দুঃস্থ-অভাবী মানুষের প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়ার প্রেরণা দেয় ঈদ। ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনি-’পরে/সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’— এই চিরন্তন সাম্য-চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষা পাই ঈদ থেকে। এই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা ঈদে আনন্দ করি। জাকাত-ফিতরা দিয়ে দরিদ্রদেরকে ঈদের খুশিতে শামিল করার চেষ্টা করি। সবার ঘরে ঘরে ঈদ আসুক রাশি রাশি আনন্দ আর খুশির ডালি নিয়ে। বন্ধুরা, এসো, কবির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও বলি: ‘বেদনার কালিগুলো সব ধুয়ে-মুছে যাক্/ ঈদমাখা হাসি-খুশি সব ঘরে ঘরে থাক্!’ ঈদুল ফিতরের এই শুভলগ্নে সবাইকে জানাই পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা— ঈদ মুবারক!